প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ ভয়াবহ আর্থিক সংকটের কারণে ৫৭১ ফিলিস্তিনি কর্মীকে ছাঁটাই করেছে। সংস্থাটি সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ায় ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। তবে চলমান আর্থিক সংকট এবং অনুদানের হ্রাসের কারণে কর্মী ছাঁটাই ছাড়া বিকল্প থাকেনি।
ইউএনআরডব্লিউএর মুখপাত্র উল্লেখ করেছেন, এই আর্থিক সংকট অভূতপূর্ব এবং তা সংস্থার কার্যক্রমকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ২০২৫ সালে সংস্থার মোট ব্যয় প্রায় ৮৮০ মিলিয়ন ডলার হলেও অনুদান হিসেবে কেবল ৫৭০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে। ফলে ২০২৬ সালে ঘাটতির মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকটের প্রধান প্রভাব পড়েছে গাজায় কর্মরত কর্মীদের ওপর। যদিও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের যুদ্ধের আগেই তারা গাজা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তবুও দূর থেকে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়নি। মুখপাত্র জানান, ছাঁটাই হওয়া কর্মীরা ১০ মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতনবিহীন ছিলেন এবং সংস্থার নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিস্থিতির কারণে তারা কখন তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৩০০ জনেরও বেশি কর্মী নিহত হয়েছে। এ অবস্থায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রায় ১২ হাজার কর্মী এখনও কাজ করে যাচ্ছেন, যারা মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই সংকটের মধ্যে কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে সরাসরি শরণার্থী ও মানবিক কার্যক্রমের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা আরও জটিলতা সৃষ্টি করেছে। ইসরাইল অভিযোগ করেছে, ইউএনআরডব্লিউএর কিছু কর্মচারী হামাসকে আশ্রয় দিচ্ছেন এবং ৭ অক্টোবরের হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। ফলে ফিলিস্তিনে সংস্থার কার্যক্রমের ওপর বিভিন্ন বাধা আরোপ করেছে। এতে সংস্থার মানবিক কার্যক্রমের গতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংস্থার মুখপাত্র বলেন, কর্মী ছাঁটাই হওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির ফল। সংস্থার প্রচেষ্টা ছিল যতদূর সম্ভব কর্মীদের কর্মসংস্থান বজায় রাখা। তবে অর্থের অভাবে এই পদক্ষেপ ছাড়া বিকল্প ছিল না। তিনি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সহায়তা অব্যাহত রাখা, এবং আমরা এই সংকট মোকাবিলার জন্য সকল সম্ভাব্য উদ্যোগ গ্রহণ করছি।”
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তকে একটি উদ্বেগজনক ঘটনা হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে ইউএনআরডব্লিউএর অবদান অপরিসীম। কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে সেবা প্রদান ব্যাহত হলে শরণার্থীদের জীবনমান ও নিরাপত্তা সরাসরি প্রভাবিত হবে।
সাংগঠনিক সংকট ও নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সংস্থা ফিলিস্তিনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সংস্থার অন্যতম লক্ষ্য, যাতে তারা পর্যাপ্ত অনুদান পেয়ে মানবিক কার্যক্রম স্থিতিশীল রাখতে পারে। ইউএনআরডব্লিউএর মুখপাত্র জানান, “আমরা স্বেচ্ছাসেবীদের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। অনুদান কমে যাওয়ায় আমাদের কার্যক্রমে বিশাল ঘাটতি দেখা দিয়েছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ফিলিস্তিনি কর্মীদের ছাঁটাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মানবিক সংস্থাগুলো কিভাবে তাদের কার্যক্রম বজায় রাখবে, তা এখন বিশ্বজনীন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা, পশ্চিম তীর ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি এলাকায় সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও তহবিল বৃদ্ধি না হলে, শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য, খাদ্য ও শিক্ষা সহায়তা আরও সংকুচিত হতে পারে। ইউএনআরডব্লিউএ এই সংকট মোকাবিলার জন্য নতুন অনুদান সংগ্রহ এবং কর্মী পুনর্ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করছে।
সংস্থার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও গাজার নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতার মধ্যে, ৫৭১ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য একটি মানবিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এখন মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য তহবিল ও সহায়তা বৃদ্ধির আহ্বান জানাচ্ছে।