প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়ায় সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় মালয়েশিয়ার সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মুহাম্মদ হাফিজুদ্দিন জান্তানকে তার দুই স্ত্রীসহ মোট পাঁচজনকে আটক করেছে দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন (মালয়েশিয়ান অ্যান্টি-করাপশন কমিশন—এমএসিসি)। অভিযোগ উঠেছে, সামরিক বাহিনীর জন্য বিপুল অঙ্কের সরঞ্জাম ক্রয়ের চুক্তিতে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ গ্রহণ ও আর্থিক অনিয়মে জড়িত ছিলেন।
মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাতে জানা গেছে, বুধবার ৭ জানুয়ারি দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর এমএসিসি তাদের হেফাজতে নেয়। অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ জব্দ হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আরও গুরুতর রূপ নেয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কমিশনার আজম বাকি জানিয়েছেন, তদন্তের অংশ হিসেবে একটি সমন্বিত অভিযান চালানো হয়, যার মাধ্যমে এই উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
এমএসিসির তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় প্রায় ২৪ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে। এই অর্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল বলে জানিয়েছে কমিশন। সে সময় সংশ্লিষ্ট একজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এই অর্থ সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটার চুক্তি থেকে প্রাপ্ত অবৈধ লেনদেনের অংশ হতে পারে।
তদন্তের স্বার্থে সাবেক সেনাপ্রধান, তার দুই স্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের পরিবারের অন্তত ছয়টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ইতোমধ্যে ফ্রিজ করা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে এবং তা কীভাবে জমা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে এমএসিসি। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক লেনদেনের এই জটিল নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে পারলে পুরো দুর্নীতিচক্রের চিত্র স্পষ্ট হবে।
এই দুর্নীতির অভিযোগ প্রথম সামনে আসে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে। তখনই সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটার কিছু চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় মালয়েশিয়া সরকার তাৎক্ষণিকভাবে জেনারেল মুহাম্মদ হাফিজুদ্দিন জান্তানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায়। যদিও সে সময় আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে বিস্তারিত অভিযোগ প্রকাশ করা হয়নি, তবে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়।
এমএসিসি সূত্রে জানা গেছে, সামরিক বাহিনীর জন্য সরঞ্জাম সরবরাহকারী কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগেই ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধানের যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সামনে আসে। তদন্তকারীরা বলছেন, ঘুষের বিনিময়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের পেছনে শক্ত প্রমাণ মিলেছে।
বুধবার রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি আটক ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এমএসিসি জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে সাবেক সেনাপ্রধান ও তার দুই স্ত্রীকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে। মামলাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় আটক অন্য দুই ব্যক্তির নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আরও দুজন ইতোমধ্যে আটক রয়েছেন।
মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের আমলা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতির কথা বারবার উল্লেখ করছে। সাবেক সেনাপ্রধানের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই অভিযান সেই নীতিরই বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক বাহিনীর মতো সংবেদনশীল ও কৌশলগত খাতে দুর্নীতির অভিযোগ দেশের নিরাপত্তা ও জনআস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় স্বচ্ছতা না থাকলে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, জাতীয় প্রতিরক্ষার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই তদন্তের ফলাফল মালয়েশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানবাধিকার ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও এই ঘটনার দিকে গভীর নজর রাখছে। তাদের মতে, যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি মালয়েশিয়ার সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে। একই সঙ্গে তারা দাবি জানিয়েছে, তদন্ত যেন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হয়।
এদিকে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা প্রাথমিকভাবে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাদের মক্কেলরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। তবে এমএসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছেন বলেই এত বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে মালয়েশিয়ার সাবেক সেনাপ্রধানের আটক হওয়ার ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে উঠেছে। এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে মালয়েশিয়ার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।