প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আজ বৃহস্পতিবার টানা ১২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। সার্ভিস লাইন নির্মাণ ও উন্নয়নকাজের জন্য এই সাময়িক বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে উত্তরা, উত্তর খান ও দক্ষিণ খানসহ আশপাশের এলাকার আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প—সব শ্রেণির গ্রাহকরা সরাসরি প্রভাবিত হবেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় সকাল থেকেই গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি শুরু হয়েছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মেসার্স বেঙ্গল ইন্ডিগো লিমিটেডের অধীনে আব্দুল্লাহপুর, উত্তরা, টঙ্গী ও গাজীপুর অংশের সার্ভিস লাইন নির্মাণ কাজের কারণে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। মোট ১২ ঘণ্টার এই কাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যমান সব শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। পাশাপাশি আশপাশের এলাকাগুলোতে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধের খবরে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শীতের এই সময়ে গ্যাস সংকটের প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। সকালে রান্না করতে না পেরে অনেক পরিবার বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা বা রাইস কুকার ব্যবহার করছেন, আবার অনেকেই বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে একদিকে যেমন বাড়তি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে দৈনন্দিন রুটিনেও ব্যাঘাত ঘটছে।
উত্তরার একটি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রাশেদ মাহমুদ বলেন, “আগে থেকে গ্যাস বন্ধের কথা জানানো হলেও বাস্তবে যখন সকাল থেকে চুলা জ্বলেনি, তখনই বোঝা গেছে আজকের দিনটা কেমন যাবে। বাসায় ছোট বাচ্চা আছে, সকালে গরম খাবার তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হয়েছে, এতে বিদ্যুৎ বিল বাড়ার চিন্তাও আছে।” একই এলাকার গৃহিণী শিউলি আক্তার জানান, শীতের সকালে গ্যাস না থাকায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে গরম পানি ও খাবার প্রস্তুত করতে।
শুধু আবাসিক নয়, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই গ্যাস বন্ধের প্রভাব অনুভব করছেন। উত্তরা ও আশপাশের এলাকায় ছোট হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি ও খাবারের দোকানগুলো গ্যাসনির্ভর হওয়ায় অনেক জায়গায় কার্যক্রম সীমিত রাখতে হয়েছে। কেউ কেউ সকাল থেকে দোকানই খুলতে পারেননি। এক রেস্তোরাঁ মালিক বলেন, “গ্যাস ছাড়া রান্না করা আমাদের জন্য খুবই কঠিন। আজ দুপুর পর্যন্ত দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে প্রতিদিনের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, এই কাজটি অত্যন্ত জরুরি। সার্ভিস লাইন নির্মাণ ও উন্নয়ন না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সাময়িক এই অসুবিধার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকদের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। বিজ্ঞপ্তিতে তারা গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং সহযোগিতা কামনা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা মহানগরীতে গ্যাস অবকাঠামো অনেক পুরোনো হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা ও শিল্প কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু পুরোনো লাইন ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায়ই লিকেজ, স্বল্পচাপ ও সরবরাহ বন্ধের ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন সার্ভিস লাইন নির্মাণ অপরিহার্য। তবে এসব কাজের সময় জনগণের ভোগান্তি কমাতে বিকল্প পরিকল্পনা ও কার্যকর যোগাযোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
তিতাস গ্যাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা চেষ্টা করি কাজগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে। আজকের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে কিছু এলাকায় চাপ স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগতে পারে।” তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই কাজ চলাকালে গ্যাস বন্ধ রাখা হয়, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ মানেই হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব। তাই এ ধরনের কাজের আগে যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও অনেক সময় তা সবার কাছে পৌঁছায় না। ফলে হঠাৎ গ্যাস না পেয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আজ সকাল থেকে এ নিয়ে নানা মন্তব্য দেখা গেছে। কেউ কেউ আগাম প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে অভিযোগ করেছেন যে বারবার গ্যাস বন্ধ হওয়া নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতাকে ব্যাহত করছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে আরও আগেভাগে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য প্রচার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কাজের সময়সীমা কমিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে, যাতে গ্রাহকদের দুর্ভোগ কম হয়।
সবশেষে বলা যায়, আজ রাত ১০টা পর্যন্ত উত্তরা, উত্তর খান ও দক্ষিণ খান এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় ভোগান্তি হলেও এটি সাময়িক। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ শেষ হলেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তবে নাগরিক জীবনে বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ও কার্যকর পরিকল্পনার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।