বিক্ষোভের চাপে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধের শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
ইরানে বিক্ষোভে ইন্টারনেট বন্ধ শঙ্কা

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানজুড়ে চলমান ব্যাপক বিক্ষোভ নতুন করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিক্ষোভের তীব্রতা ও বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকার আবারও ইন্টারনেট বন্ধের পথে হাঁটতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নির্বাসিত ও স্বঘোষিত যুবরাজ রেজা পাহলভি। তার ভাষায়, এই আন্দোলন শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত ও সংগঠিত প্রতিরোধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার পরবর্তী ধাপ হতে পারে বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাত ৮টার সমন্বিত কর্মসূচি।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় রেজা পাহলভি বলেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভীত। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে—সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আবারও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। তার মতে, এটি নতুন কিছু নয়; অতীতেও বিক্ষোভ দমাতে ইরানি কর্তৃপক্ষ তথ্যপ্রবাহ বন্ধের কৌশল নিয়েছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ জনগণের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন আর এককভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেই।

রেজা পাহলভি তার বার্তায় জোর দিয়ে বলেন, “ইন্টারনেট বন্ধ করলেও আমাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাবে না।” তিনি উল্লেখ করেন, ইরানে ইতোমধ্যে লাখ লাখ স্টারলিংক ডিভাইস সক্রিয় রয়েছে, যা বিকল্প যোগাযোগের পথ খুলে দিয়েছে। পাশাপাশি ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও মানোটো নেটওয়ার্কের মতো প্রবাসী গণমাধ্যমও আন্দোলনকারীদের তথ্য আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার ভাষায়, এই বিকল্প মাধ্যমগুলো থাকায় সরকার আর আগের মতো তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

এদিকে বিক্ষোভের মধ্যেই ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদে এক প্রতীকী ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত ফুটেজে দেখা যায়, একদল বিক্ষোভকারী সেখানে একটি বিশাল জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলছে। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও পতাকাটি ঠিক কোন স্থানে ছিল এবং ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট কী—সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবুও এই দৃশ্য ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক গভীর প্রতীকী বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে ইতোমধ্যে বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, চলমান আন্দোলনে এ পর্যন্ত প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৩৫ জনে। নিহতদের মধ্যে ২৯ জন বিক্ষোভকারী, চার শিশু এবং ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য রয়েছেন বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এক হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলেও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে অন্তত ৩০০ জন পুলিশ ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সদস্য আহত হয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি সূত্রের এই ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পরিস্থিতির জটিলতা ও তথ্যযুদ্ধের দিকটিও স্পষ্ট করে তুলছে।

এই উত্তাল পরিস্থিতিতে কড়া বার্তা দিয়েছেন ইরানের প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেছেন, যারা সহিংসতা সৃষ্টি করছে বা বিক্ষোভে উসকানি দিচ্ছে, তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থে কাজ করছে। তার ভাষায়, দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খলা ও অনিরাপত্তা তৈরি করে বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সড়কে অশান্তি সৃষ্টি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্টকারীদের কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না।

একই সুরে কথা বলেছেন ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আমীর হাতামি। তিনি বলেন, যেকোনো আগ্রাসন বা অস্থিতিশীলতার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তার দাবি, ইরানের সামরিক প্রস্তুতি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী এবং দেশ রক্ষায় বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই বক্তব্য অনেকের কাছে সরকারের শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেও, সমালোচকদের মতে এটি বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপের পূর্বাভাসও হতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানে ইন্টারনেট বন্ধের সম্ভাবনা বাস্তব। অতীতে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, সামাজিক অধিকার ও রাজনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করে হওয়া আন্দোলনের সময় সরকার একাধিকবার ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করেছে। এতে করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও দেশের অভ্যন্তরে তথ্য প্রবাহ পুরোপুরি থামানো যায়নি। এবারও একই কৌশল নেওয়া হলে, তা সাময়িকভাবে বিক্ষোভের সমন্বয় দুর্বল করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ইন্টারনেট বন্ধ মানে শুধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা নয়; এটি তথ্য জানার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জরুরি সেবার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যখন সহিংসতায় আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে, তখন তথ্যপ্রবাহ সীমিত করা পরিস্থিতিকে আরও মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

রেজা পাহলভি তার বার্তায় ইরানি জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তির নয়, বরং একটি জাতির সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তার মতে, ভয় ও দমননীতির মাধ্যমে জনগণের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে, ইরান এখন এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে সরকার কঠোর অবস্থান ও নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলছে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা সংগঠিত প্রতিরোধের পথে এগোচ্ছে। এর মাঝখানে ইন্টারনেট বন্ধের সম্ভাবনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আগামী কয়েক ঘণ্টা ও দিনগুলোই নির্ধারণ করবে—এই আন্দোলন কোন পথে মোড় নেয় এবং ইরান কতটা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত