ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র, ভাঙচুর সোলাইমানির ভাস্কর্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
ইরানে বিক্ষোভ সোলাইমানির ভাস্কর্য

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দিন দিন আরও তীব্র ও সহিংস রূপ নিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে টানা আন্দোলনের মধ্যে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানির একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছেন বিক্ষোভকারীরা। ফার্স প্রদেশে সংঘটিত এই ঘটনা ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চলমান আন্দোলনের ১১তম দিনে বুধবার (৭ জানুয়ারি) ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করেন, যা দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে।

ইরানে কাসেম সোলাইমানি শুধু একজন সামরিক কমান্ডার নন, বরং রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘জাতীয় বীর’ ও বিপ্লবী প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়ে আসছেন। ২০২০ সালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে এক মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরান সরকার তাকে শহীদ ঘোষণা করে এবং দেশজুড়ে তার ভাস্কর্য, ছবি ও স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে তার ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা কেবল একটি স্থাপনা ধ্বংস নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় বয়ান ও ক্ষমতার প্রতীকগুলোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত থেকেই ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ আরও সহিংস আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। অতীতেও দেখা গেছে, বড় ধরনের আন্দোলনের সময় ইরান সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত করে দেয়, যাতে আন্দোলনকারীদের সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদান ব্যাহত হয়। তবে এবারও সেই কৌশল পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও রাজধানী তেহরানসহ ইস্ফাহান, শিরাজ, মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন।

বিক্ষোভের অংশ হিসেবে ইস্ফাহানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ভবনে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইয়েনেত নিউজ জানায়, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের মোটরসাইকেল, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভবন, গভর্নরের কার্যালয় এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে দেন। এসব ঘটনা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় ও সংঘাতপূর্ণ আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষোভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা রাজনৈতিক অসন্তোষ, সামাজিক হতাশা এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ইরানের জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা ও মতপ্রকাশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।

এই আন্দোলনের পেছনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলেভির ছেলে রেজা পেহলেভির ভূমিকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রবাসী ইরানিদের প্ল্যাটফর্মে দেওয়া তার আহ্বানে বৃহস্পতিবারও বহু মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানান। যদিও ইরানের ভেতরে রেজা পেহলেভির সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু তার আহ্বান আন্দোলনকারীদের একটি অংশের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এই আন্দোলনের সূচনা ঘটে মূলত অর্থনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ রেখে আন্দোলন শুরু করেন। ঐতিহাসিকভাবে ইরানে গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। তাদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পরপরই তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত হন। টানা ১২ দিন ধরে চলা এই আন্দোলন এখন আর কেবল বাজারকেন্দ্রিক নেই; বরং তা দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কাসেম সোলাইমানির ভাস্কর্য ভাঙচুর এই আন্দোলনের একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। কারণ এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে সোলাইমানি ছিলেন আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম মুখ। তার ভাস্কর্য ভাঙা মানে সেই আখ্যানের বিরুদ্ধেই জনরোষের প্রকাশ।

অন্যদিকে সরকার সমর্থকরা এই ঘটনাকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং বিদেশি শক্তির মদদে সৃষ্ট অস্থিরতা বলে দাবি করছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো বিক্ষোভকারীদের একটি অংশকে ‘সহিংস দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরানে চলমান এই বিক্ষোভ দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন রাষ্ট্রীয় প্রতীক ভাঙচুর ও ক্ষমতার কেন্দ্রে সরাসরি চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। এই সংকট কীভাবে সমাধান হবে, সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং আন্দোলনকারীরা কতটা সংগঠিত হতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত