প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে যখন প্রচারণার গতি বাড়ছে, ঠিক সেই সময় ফরিদপুর-৪ আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা–সদরপুর–চরভদ্রাসন নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেনকে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ করা হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থানেরই একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে এই পদক্ষেপকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি মাওলানা সরোয়ার হোসেনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশ প্রদান করেন মোহাম্মদ রুহুল আমিন, সিভিল জজ, ফরিদপুর এবং নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি, জাতীয় সংসদীয় আসন-২১৪-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। নোটিশে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি অনুমোদনহীনভাবে এমন কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, যা সরাসরি নির্বাচনী আচরণবিধির পরিপন্থী। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নজরে আসে এবং কমিশনের নির্দেশনায় এই নোটিশ জারি করা হয়।
নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি ছিল নির্দিষ্ট কিছু প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে, যেখানে অনুমোদিত সীমার বাইরে জনসমাগম, প্রচারের ধরন এবং আচরণবিধিতে নিষিদ্ধ কিছু কার্যকলাপের আলামত পাওয়া গেছে। যদিও নোটিশে নির্দিষ্ট করে সব অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে বলা হয়েছে যে এসব কর্মকাণ্ড নির্বাচনী আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, মাওলানা সরোয়ার হোসেনকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিতভাবে তার ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে। এই ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না এলে তার বিরুদ্ধে নির্বাচন আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে জরিমানা, প্রচারণার ওপর বিধিনিষেধ কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের মতো পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেন বা তার নির্বাচনী টিমের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ নির্বাচনের মাঠে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য জরুরি, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, শোকজের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
ফরিদপুর-৪ আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন নিয়ে গঠিত এই আসনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতি চলে আসছে। এবারের নির্বাচনে এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কোনো প্রার্থীকে শোকজ করা হলে তা স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশন এবার আচরণবিধি প্রতিপালনের বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, পোস্টার-ব্যানার ব্যবহার, যানবাহন ব্যবহার এবং জনসমাগমের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম ভাঙা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের। ফরিদপুরের এই ঘটনাও সেই কঠোর নজরদারির অংশ।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন, “নির্বাচন যদি সবার জন্য সমান নিয়মে পরিচালিত না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। শোকজ দেওয়া মানে এই নয় যে প্রার্থী দোষী সাব্যস্ত, কিন্তু নিয়ম মানার বার্তা দেওয়া জরুরি।”
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের শোকজ নোটিশ নির্বাচনী প্রচারণায় মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব দল বা প্রার্থী প্রশাসনিক নজরদারিকে সন্দেহের চোখে দেখে, তাদের জন্য বিষয়টি বাড়তি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে আইনের দৃষ্টিতে সব প্রার্থী সমান এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
নির্বাচনী আচরণবিধি মূলত প্রার্থীদের জন্য একটি ন্যায্য ও সুশৃঙ্খল প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে প্রণীত। এতে নির্ধারিত সময় ও সীমার বাইরে প্রচারণা, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক উসকানি, সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার, অতিরিক্ত অর্থব্যয় বা শক্তি প্রদর্শনের মতো বিষয়গুলো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ফরিদপুরের ঘটনায় কোন কোন বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে, তা লিখিত জবাব পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে অনুসন্ধান কমিটি।
এই শোকজ নোটিশের পর সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিষ্পত্তি হয় এবং এর প্রভাব নির্বাচনের ওপর কতটা পড়ে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং আইন ও প্রমাণই একমাত্র বিবেচ্য।
সব মিলিয়ে, ফরিদপুর-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থীকে শোকজ করার ঘটনা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আচরণবিধি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের সক্রিয়তারই একটি উদাহরণ। এখন দেখার বিষয়, প্রার্থী তার ব্যাখ্যায় কী তুলে ধরেন এবং নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সাধারণ ভোটাররা।