প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও গাজা উপত্যকায় থামেনি ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসন। বৃহস্পতিবার দিনভর গাজার বিভিন্ন এলাকায় চালানো হামলায় পাঁচ শিশুসহ কমপক্ষে ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় গাজার সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের অস্থায়ী তাঁবুতে চালানো এক হামলায় কমপক্ষে চারজন নিহত হন। এই এলাকায় মূলত যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো মানুষজন তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভোরের দিকে হঠাৎ আকাশ থেকে গোলাবর্ষণ শুরু হলে তাঁবুগুলো মুহূর্তের মধ্যে আগুনে পুড়ে যায়। নারী ও শিশুরা চিৎকার করতে করতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যান, কিন্তু অনেকেই বের হতে পারেননি।
গাজা সিটির জেইতুন এলাকাতেও চালানো হয় আরেকটি হামলা। এতে চারজন নিহত হন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে একজন নারী ও একজন কিশোর রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজ চালানো হলেও ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
মধ্য গাজার বুরেইজ ও নুসেইরাত শরণার্থী শিবির এলাকাতেও হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এসব হামলায় আরও চারজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শিবিরের বাসিন্দারা বলছেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তারা কিছুটা স্বস্তির আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। হামসা হাউসু নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশু ইসরাইলি গুলিতে নিহত হয়। শিশুটির চাচা খামিস হাউসু কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, গভীর রাতে হঠাৎ চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে যায় তার। উঠে দেখেন, হামসা মেঝেতে পড়ে আছে, তার নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শিশুটিকে বাঁচানো যায়নি।
এই ঘটনার পর জাবালিয়া এলাকার মানুষ শোকে স্তব্ধ। প্রতিবেশীরা বলছেন, হামসা কোনো যোদ্ধা ছিল না, সে ছিল স্কুলপড়ুয়া শিশু। যুদ্ধবিরতির সময় এমন ঘটনা তাদের কাছে অবিশ্বাস্য ও অমানবিক বলে মনে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় এই চুক্তি হলেও বাস্তবে গাজায় সহিংসতা থামেনি। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ করছে, ইসরাইল নিয়মিতভাবেই যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি) বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি হামলাকে স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ বলে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, ইসরাইল কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সম্মান করে না। তারা ফিলিস্তিনিদের নির্মূল ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বাসঘাতকতা এবং তথাকথিত নিরাপত্তা অজুহাতের আশ্রয় নিচ্ছে।
গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪২৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ২০৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। হাসপাতালগুলোতে জায়গা না থাকায় অনেক আহতকে করিডোর ও খোলা জায়গায় চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ওষুধ, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার গাজায় অবিলম্বে হামলা বন্ধের আহ্বান জানালেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা চলতে থাকলে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে। লাখো মানুষ খাদ্য, পানি ও নিরাপদ আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়বে।
গাজার সাধারণ মানুষের ভাষ্য, যুদ্ধবিরতি এখন তাদের কাছে কেবল একটি কাগুজে শব্দ। প্রতিদিনই তারা বোমা, গুলি ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। শিশুদের চোখে ঘুম নেই, বৃদ্ধদের মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শান্তির প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ভয়াবহ ব্যবধানের মধ্যে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনি জনগণ।