রেকর্ড সামরিক বাজেটের পথে ট্রাম্প প্রশাসন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯৩ বার
ট্রাম্পের রেকর্ড সামরিক বাজেট পরিকল্পনা

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আরও বহুগুণে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে নতুন করে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল সামরিক বাজেট প্রস্তাব করে তিনি ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিকে এগোতে চান বলে জানিয়েছেন। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসেই নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একটি নতুন নজির স্থাপন করবে।

মার্কিন গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত সামরিক বাজেট ছিল প্রায় ৯০১ বিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় নতুন প্রস্তাবিত বাজেট প্রায় ৬৬ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদ ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শান্তিকালীন সময়ে কোনো দেশের সামরিক বাজেটে এমন লাফ ইতিহাসে খুবই বিরল। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে একেবারে ‘পরবর্তী স্তরে’ নিয়ে যেতে চায়।

বুধবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি “ড্রিম মিলিটারি” গড়ে তুলতে হবে, যা যে কোনো বৈশ্বিক সংকটে তাৎক্ষণিক ও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারবে। তার ভাষায়, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক। সংবিধান অনুযায়ী, সামরিক বাজেটসহ ফেডারেল বাজেট চূড়ান্ত করতে কংগ্রেসের অনুমোদন অপরিহার্য। বর্তমানে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে এত বড় ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে দলের ভেতরেই মতভেদ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাই অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় ও ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

ট্রাম্প অবশ্য বাজেট ঘাটতির আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ও ট্যারিফ থেকে যে বিপুল রাজস্ব আসবে, তা দিয়েই এই অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় মেটানো সম্ভব। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির জন্য বিদেশি দেশগুলোকে দায়ী করে আসছেন এবং শুল্ক নীতিকে নিজের অর্থনৈতিক কৌশলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তবে নিরপেক্ষ থিঙ্ক ট্যাংক ও বাজেট বিশ্লেষকদের হিসাব ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তাদের মতে, বর্তমান শুল্ক কাঠামো থেকে যে রাজস্ব আসছে, তা দিয়ে প্রস্তাবিত সামরিক ব্যয়ের সর্বোচ্চ অর্ধেকের বেশি মেটানো সম্ভব নয়। ফলে বাকি অর্থ যোগান দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ঋণের পথে হাঁটতে হবে, যা আগামী কয়েক বছরে জাতীয় ঋণ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সুদের বোঝা বৃদ্ধি, সামাজিক খাতে ব্যয় সংকোচন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই বাজেট প্রস্তাবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ট্রাম্পের প্রতিরক্ষাশিল্প সংশ্লিষ্ট বড় কোম্পানিগুলোর প্রতি কঠোর বার্তা। একই ঘোষণায় তিনি অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে ধীরগতির অভিযোগ তুলে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের সমালোচনা করেন। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ানো পর্যন্ত এসব কোম্পানি লভ্যাংশ বিতরণ বা শেয়ার বাইব্যাকের মতো সুবিধা নিতে পারবে না। তার মতে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মুনাফার চেয়ে দায়িত্ববোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার বন্ধের পর লেনদেনে লকহিড মার্টিন, জেনারেল ডায়নামিক্সসহ বড় প্রতিরক্ষা কোম্পানির শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, এত বড় সামরিক বাজেট অনুমোদিত হলে এসব কোম্পানির জন্য নতুন চুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের লাভই বাড়াবে।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও ট্রাম্পের এই বাজেট প্রস্তাবকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা, ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়ন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলকে ঘিরে উত্তেজনা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ নাজুক। এসব বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে চান বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এ ছাড়া ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড সংশ্লিষ্ট ইস্যুতেও সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তার এবং আর্কটিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

তবে সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করছে, এই বাজেট প্রস্তাব মূলত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। আসন্ন নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে ট্রাম্প নিজেকে ‘শক্তিশালী নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন বলে তাদের অভিযোগ। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে পর্যাপ্ত অর্থের অভাব রয়েছে, তখন এত বিশাল সামরিক ব্যয় কতটা যৌক্তিক।

মানবাধিকার সংগঠন ও শান্তিকামী গোষ্ঠীগুলোও এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত সামরিক শক্তি বিশ্বজুড়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং সংঘাতের ঝুঁকি আরও তীব্র করবে। অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, শক্তিশালী সামরিক বাহিনীই যুদ্ধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়, কারণ শক্ত অবস্থান থেকেই কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব।

সব মিলিয়ে, ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ট্রাম্পের প্রস্তাবিত রেকর্ড সামরিক বাজেট যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক কৌশল—সব ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। কংগ্রেসে এই প্রস্তাব কতটা সমর্থন পায় এবং শেষ পর্যন্ত কী পরিমাণ বাজেট অনুমোদিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, ট্রাম্পের এই ঘোষণা ইতোমধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত