বছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সে উজ্জ্বল বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
বছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সে উজ্জ্বল বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি,২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন বছরের শুরুতেই প্রবাসী আয়ে আশাব্যঞ্জক বার্তা পেল বাংলাদেশ। চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম সাত দিনেই দেশে এসেছে প্রায় ৯১ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি জানুয়ারির ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ৯০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে প্রায় ১২ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। গত বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৫৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার, যা এবার এক বছরের ব্যবধানে অনেকটাই বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, শুধু ৭ জানুয়ারি এক দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। এক দিনে এতো বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ও প্রবাসীদের আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। জুলাই থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের কিছু বেশি সময়ে দেশে এসেছে মোট ১ হাজার ৭১৭ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবাহ প্রায় ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে আস্থা ফেরার একটি বড় প্রমাণ।

গত কয়েক মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে দেশে এসেছে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এটি চলতি অর্থবছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ এবং দেশের ইতিহাসে এক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। এর আগে নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। অক্টোবর ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশে আসে যথাক্রমে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার এবং ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগস্ট ও জুলাই মাসে এই অঙ্ক ছিল যথাক্রমে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার এবং ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে যে প্রবাসী আয় এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্ত ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপের মধ্যেও প্রবাসীরা নিয়মিতভাবে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন, যা দেশের জন্য স্বস্তির খবর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হুন্ডি ও অবৈধ চ্যানেল কমে আসা, বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহ দেওয়া এবং ডিজিটাল রেমিট্যান্স সেবার বিস্তারের ফলেই এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা এবং ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতামূলক রেটও প্রবাসীদের বৈধ পথে টাকা পাঠাতে আগ্রহী করে তুলছে।

অন্যদিকে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এটি দেশের ইতিহাসে কোনো এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের রেকর্ড। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই রেকর্ড ভাঙা প্রবাহ দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য রক্ষায় বড় অবদান রেখেছে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকারকে সহায়তা করেছে।

প্রবাসী আয় বৃদ্ধির এই ধারা সাধারণ মানুষের জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলে রেমিট্যান্সনির্ভর পরিবারগুলোর আয় বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানে ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতে ভোগব্যয় বাড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতভাবে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রবাসীরা যেভাবে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাচ্ছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের শেষে রেমিট্যান্স নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে হলে প্রবাসী শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং প্রবাসীদের আস্থা ধরে রাখা জরুরি। একই সঙ্গে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন বাজার খোঁজা এবং প্রবাসীদের ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

সব মিলিয়ে বছরের প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ৯১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি শক্ত বার্তা বহন করছে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে এই প্রবাহ রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি দেবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করবে—এমনটাই প্রত্যাশা নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত