প্রকাশ:০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় যৌথ বাহিনীর একদিনের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র, গুলি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযানে পাঁচজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এই অভিযান এখনও চলমান রয়েছে এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত আছে।
স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, গত ৮ জানুয়ারি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রিন্ট ও অনলাইন সংস্করণে ‘অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নেই তৎপরতা, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উঠে আসার পরপরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় দ্রুত যৌথ বাহিনীর সমন্বিত অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শুক্রবার ৯ জানুয়ারি ভোরে গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান শুরু হয়। ৩৪ বীর ওসমানীনগর আর্মি ক্যাম্পের বিএ লেফটেন্যান্ট মো. তানজিলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর দুটি টহল দল এবং ওসমানীনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টহল দল যৌথভাবে এতে অংশ নেয়। অভিযানের লক্ষ্য ছিল অবৈধ অস্ত্রের সম্ভাব্য মজুতস্থল শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা।
অভিযানটি পরিচালিত হয় ওসমানীনগর উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের সিকান্দারপুর গ্রামে। সেখানে মো. আফিকুর রহমান (৪০)-এর বাড়িকে কেন্দ্র করে অভিযান চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী এই বাড়িতে অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জাম মজুত থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।
অভিযান চলাকালে বাড়ির মালিক আফিকুর রহমানকে পাওয়া না গেলেও তার বসতঘর ও আশপাশের স্থান তল্লাশি করে দুটি একনলা বন্দুক, ১০ রাউন্ড গুলি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। একই সময় ঘটনাস্থল থেকে তার সহযোগী হিসেবে সন্দেহভাজন পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউরা গ্রামের মৃত ইউসুফ উল্লাহর পুত্র গিয়াস উদ্দিন, নবীগঞ্জ থানার রিফাতপুর গ্রামের মৃত গেদা মিয়ার পুত্র মো. হাবু মিয়া (৪০), ওসমানীনগর থানার সিকান্দারপুর গ্রামের মৃত আব্দুল গফুরের পুত্র মো. মজিবুর রহমান (৩২), একই গ্রামের জয়নাল আবেদীনের পুত্র সাঈদ আহমদ এবং তাজপুর ইউনিয়নের ভাড়েরা গ্রামের মো. ফারুক আহমদের পুত্র নাইমুর রহমান (২৪)। গ্রেপ্তারকৃতদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে ও অন্যান্য অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে দুটি একনলা বন্দুক, ১০ রাউন্ড গুলি, দুটি ওয়াকিটকি সেট, একটি বাইনোকুলার, একটি পাওয়ার ব্যাংক, একটি এনালগ মাল্টিমিটার, একটি হেড ল্যাম্প, একটি ইলেকট্রিক শক টর্চ, একটি অ্যাকশন ক্যামেরা, ১২টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, তিনটি মেমোরি কার্ড এবং একটি আয়রন কাটার। এসব সরঞ্জাম দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এগুলো পরিকল্পিত অপরাধ, গোষ্ঠীগত হামলা কিংবা সংঘবদ্ধ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই মজুত রাখা হয়েছিল।
পুলিশ ও সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানায়, উদ্ধারকৃত ওয়াকিটকি, বাইনোকুলার ও অ্যাকশন ক্যামেরার মতো সরঞ্জাম সাধারণত নজরদারি ও যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা হয়, যা সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের তৎপরতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন ও মেমোরি কার্ড উদ্ধার হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, এই চক্রের সঙ্গে আরও অনেক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান হতো।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা ও রাতে সন্দেহজনক চলাচল লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। তবে ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। অভিযানের পর এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, অবৈধ অস্ত্রের খবর নিয়ে তারা আতঙ্কে ছিলেন। যৌথ বাহিনীর এই অভিযানে অন্তত আপাতত সেই আতঙ্ক অনেকটাই কেটেছে।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গোষ্ঠীগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এসব অস্ত্র ও সরঞ্জাম মজুত করেছিল। তবে এর পেছনে ঠিক কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে এসব অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা জানতে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
অভিযান শেষে উদ্ধারকৃত অস্ত্র, গুলি ও অন্যান্য আলামতসহ গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজনকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওসমানীনগর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়েরের পাশাপাশি অন্য কোনো অপরাধে সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুরশেদুল আলম ভূঁইয়া অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি তিনি অবগত। তবে অভিযানের বিস্তারিত প্রতিবেদন এখনও থানায় পৌঁছায়নি। তিনি আরও জানান, এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতার আগেই তা প্রতিহত করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, ওসমানীনগরে যৌথ বাহিনীর এই সফল অভিযান শুধু একটি অস্ত্র উদ্ধার অভিযান নয়, বরং এলাকায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা। অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আরও ইতিবাচক ফল আসবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের।