প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়া শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ইউক্রেনে হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা এবং ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। হামলার সময় রাতভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল এবং এটি একটি ব্যাপক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বাসভবনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলার চেষ্টার জবাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। মস্কো দাবি করেছে, হামলার মাধ্যমে প্রতিহত করার পাশাপাশি শত্রুপক্ষকে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে কিয়েভ এই দাবিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং জানিয়েছে, নভগোরোদ অঞ্চলে অবস্থিত পুতিনের বাসভবনে কোনো হামলার চেষ্টা ইউক্রেন করেনি।
ইউক্রেনের লভিভ অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন, রাশিয়ার হামলায় একটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, সেটি হতে পারে একটি বৃহৎ ভূগর্ভস্থ গ্যাস সংরক্ষণাগার। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইউক্রেনীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, যার গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার বা ৮ হাজার মাইল।
ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রটি রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তির নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে রাশিয়া প্রথমবারের মতো এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেনের একটি সামরিক কারখানায় হামলার দাবি করেছিল। যদিও সেই সময় ইউক্রেনীয় সূত্র জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রটিতে বিস্ফোরক নয়, বরং ডামি ওয়ারহেড ছিল এবং এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, মধ্যম-পাল্লার ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এর গতি শব্দের গতির ১০ গুণেরও বেশি। তিনি আরও দাবি করেছেন, প্রচলিত ওয়ারহেড ব্যবহৃত হলেও এর ধ্বংসক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্রের সমান। পুতিনের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নজর কাড়েছে এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক করেছে।
তবে পশ্চিমা কিছু কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক ওরেশনিকের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। মার্কিন এক কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে না এবং এর ব্যবহার সীমিতভাবে কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, উচ্চ গতির কারণে এটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এর ধ্বংসক্ষমতা কিছুটা সীমিত।
বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম রাশিয়ার এই হামলাকে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির একটি নতুন ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সাম্প্রতিক হামলায় উভয় পক্ষই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধ কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করছে এবং এটি ভবিষ্যতের সামরিক প্রতিযোগিতার অংশ হতে পারে।
রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের পটভূমিতে এই ঘটনা আরও উত্তেজনা তৈরি করেছে। ইউক্রেনীয় নাগরিকরা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পাহারায় রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাইপারসনিক অস্ত্রের ব্যবহার শুধু সামরিক দিক নয়, কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের এই নতুন ধাপ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একযোগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইপারসনিক প্রযুক্তি ভবিষ্যতে যুদ্ধ কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকেও প্রভাব ফেলবে।