এক জালেই ৬৮৭ লাল কোরাল, টেকনাফে ১০ লাখ টাকার মাছ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৯ বার
এক জালেই ৬৮৭ লাল কোরাল, টেকনাফে ১০ লাখ টাকার মাছ

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে দীর্ঘদিন পর মিলেছে বিরল ও মূল্যবান সামুদ্রিক সম্পদের বড় চালান। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিন চ্যানেলে একটি মাত্র জালে একসঙ্গে ধরা পড়েছে ৬৮৭টি লাল কোরাল মাছ, যা স্থানীয়ভাবে কোরাল বা ভেটকি নামেও পরিচিত। এসব মাছ বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকায়। এই খবরে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপসহ আশপাশের জেলে পাড়া ও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোচনার।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিকেলে মোহাম্মদ জাকারিয়ার মালিকানাধীন একটি মাছধরা ট্রলারে করে ধরা পড়া লাল কোরালগুলো শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া ফিশারিজ ঘাটে আনা হয়। দীর্ঘ সময় পর এত বড় পরিমাণ কোরাল মাছ একসঙ্গে আসায় ঘাট এলাকায় উৎসুক মানুষ ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভিড় জমে। কেউ মাছ দেখতে এসেছেন, কেউ আবার দরদাম জানতে কিংবা কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।

ট্রলার মালিক মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, মঙ্গলবার সকালে শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া ফিশারিজ ঘাট থেকে তার ট্রলারটি বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ট্রলারের মাঝি আবুল কালামের নেতৃত্বে নয়জন মাঝিমাল্লা এতে অংশ নেন। বিকেলের দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের উত্তর পাশে সেন্টমার্টিন চ্যানেলের মৌলভীর শীল এলাকায় নোঙর করে জাল ফেলা হয়। সারারাত অপেক্ষার পর বুধবার সকালে জাল তুলতেই সবাই বিস্মিত হন—এক জালেই উঠে আসে শত শত লাল কোরাল মাছ।

তিনি বলেন, “অনেক দিন ধরেই সাগরে মাছ কম পাওয়া যাচ্ছিল। এমন বড় চালান পাওয়ার আশা আমরা করিনি। জাল তোলার সময় যখন দেখি এত কোরাল মাছ, তখন আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না।” ধরা পড়া ৬৮৭টি মাছের মধ্যে ট্রলারের জন্য ১০টি মাছ রাখা হয় এবং বাকি ৬৭৭টি মাছ বিক্রির জন্য ঘাটে তোলা হয়।

প্রথমে মাছগুলোর দাম হাঁকা হয় মণপ্রতি ২৪ হাজার টাকা দরে মোট প্রায় ১২ লাখ টাকা। তবে ক্রেতা ও বিক্রেতার দর কষাকষির পর মণপ্রতি ২৩ হাজার টাকা দরে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকায় মাছগুলো বিক্রি হয়। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এটি একটি ভালো দাম এবং জেলেদের জন্য বড় স্বস্তির খবর।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী রহিম উল্লাহ বলেন, “লাল কোরাল বা ভেটকি মাছ খুবই সুস্বাদু এবং চাহিদাসম্পন্ন। এই মাছ সব সময় বাজারে পাওয়া যায় না। তাই যখন বড় চালান আসে, তখন দাম তুলনামূলক বেশি হয়।” তিনি জানান, মাছগুলো বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সেখান থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আড়তে পাঠানো হবে।

শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাসান বলেন, “সেন্টমার্টিন চ্যানেল মূলত গভীর সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় এখানে লাল কোরাল তুলনামূলক বেশি ধরা পড়ে। এক জালেই ৬৮৭টি কোরাল মাছ ধরা পড়া সত্যিই বিরল ঘটনা।” তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সাগরে মাছের আকাল থাকলেও এই চালান জেলেদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। অন্য জেলেরাও এখন সেন্টমার্টিন চ্যানেলে জাল ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাল কোরাল মাছ মূলত গভীর সমুদ্রের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি প্রজাতি। টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন চ্যানেলের মতো এলাকায় নির্দিষ্ট মৌসুমে এদের উপস্থিতি বাড়ে। টেকনাফ উপজেলার জ্যেষ্ঠ সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা উমূল ফারা বেগম তাজকিরা জানান, কোরাল মাছ দেশজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে চাহিদা অনেক বেশি।

তিনি বলেন, “এই মাছ সাধারণত এক থেকে নয় কেজি পর্যন্ত ওজনের হয়ে থাকে। বঙ্গোপসাগরের গভীর জল ছাড়াও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, পূর্ব আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঞ্চলেও এর উপস্থিতি রয়েছে।” তার মতে, সরকারের নির্ধারিত প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ যথাযথভাবে মানা হওয়ায় বর্তমানে সাগরে তুলনামূলক বড় আকারের মাছ পাওয়া যাচ্ছে।

জেলেরা বলছেন, কয়েক মাস ধরে সাগরে মাছ কম থাকায় তারা আর্থিকভাবে বেশ চাপের মধ্যে ছিলেন। এই এক দিনের বড় সাফল্য তাদের সেই হতাশা অনেকটাই দূর করেছে। একজন মাঝিমাল্লা বলেন, “ঝড়-ঝঞ্ঝা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে সাগরে নামতে হয়। এমন দিনে বড় মাছ ধরা পড়লে পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।”

মৎস্য সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সাগরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি বিধিনিষেধ মেনে চলা হলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের মাছ পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, সেন্টমার্টিন চ্যানেলে এক জালে ৬৮৭টি লাল কোরাল মাছ ধরা পড়ার ঘটনা শুধু আর্থিক দিক থেকেই নয়, বরং দেশের সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা ও সংরক্ষণের গুরুত্বের কথাও নতুন করে সামনে এনেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত