আন্তর্জাতিক আইন নয়, আমার নৈতিকতাই সীমা: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন মন্তব্য

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক আইন মানার প্রশ্নে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বিদেশে সামরিক অভিযান ও হস্তক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার মুখে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে নিজের নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত চিন্তাধারাই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান নিয়ামক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয় সময় বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, আন্তর্জাতিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার কোনো সীমা আছে কি না। উত্তরে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, একটি বিষয় আছে—আমার নিজের নৈতিকতা। আমার নিজের চিন্তাধারা। এটিই একমাত্র জিনিস, যা আমাকে থামাতে পারে।” ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক দেশে সামরিক হামলা চালিয়েছে।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, “আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। আমি মানুষের ক্ষতি করতে চাই না।” তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যেও গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কারণ আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে সামরিক অভিযান চালানো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত বিষয়।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই ভেনেজুয়েলা, ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, ইরাক ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এসব অভিযানে কখনো সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, আবার কখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এসব হামলার ফলে বহু বেসামরিক নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা আরও বেড়েছে।

বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, অনেকেই একে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপ ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে আরও নড়বড়ে করে তুলতে পারে।

এর আগে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলেন। তবে একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, বিষয়টি “আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে।” এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়, আন্তর্জাতিক আইনকে তিনি একটি আপেক্ষিক ধারণা হিসেবে দেখেন, যা তার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল।

ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। রিপাবলিকান দলের সিনেটর সুসান কলিন্স ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “মাদুরোকে যথাযথভাবে আটক করার পর পরিস্থিতি বদলেছে। নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযান ছিল অসাধারণ দক্ষতা ও জটিলতার দৃষ্টান্ত। আমি সেটিকে সমর্থন করি। তবে কংগ্রেসের নির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলা বা গ্রিনল্যান্ডে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পাঠানো বা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির পক্ষে আমি নই।”

সিনেটর কলিন্সের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বারবারই অভিযোগ উঠেছে, প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছেন, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের “নিজস্ব নৈতিকতা” কেন্দ্রিক বক্তব্য আসলে তার রাজনৈতিক দর্শনেরই প্রতিফলন। তিনি বরাবরই বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। ন্যাটো, জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তি—সব ক্ষেত্রেই তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে প্রচলিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর বাইরে গিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, আন্তর্জাতিক আইনকে অবহেলা করলে বিশ্বব্যবস্থায় একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে পারে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যদি নিজেদের ইচ্ছামতো সামরিক শক্তি প্রয়োগ শুরু করে, তাহলে ছোট ও দুর্বল দেশগুলোর নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী নীতি ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও ইয়েমেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এসব অঞ্চলে সামরিক সমাধানের পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন ছিল।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক আইন নয়, নিজের নৈতিকতাকে সিদ্ধান্তের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরে ডনাল্ড ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করলেন, তার নেতৃত্ব কতটা বিতর্কপ্রবণ এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে কতটা প্রভাব বিস্তারকারী। এই বক্তব্য ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে বিশ্ববাসী এখন গভীরভাবে নজর রাখছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত