প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবারও শুরু হয়েছে নতুন করে বিতর্ক, উত্তেজনা আর সমালোচনার ঝড়। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় ক্রিকেটের গণ্ডি পেরিয়ে কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা ও ক্রিকেট প্রশাসনের ভেতরের দ্বন্দ্ব পর্যন্ত। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক নাজমুল হোসেনের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। সেই স্ট্যাটাসে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার তামিম ইকবালকে ইঙ্গিত করে ‘ভারতীয় দালাল’ আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা ক্রিকেটপ্রেমী মহলে ক্ষোভ ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি আইপিএলে বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে। অনেকেই এটিকে কেবল একটি ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলেও, কেউ কেউ বিষয়টির পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেন। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিসিবি পরিচালক নাজমুল হোসেনের মন্তব্য আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে দেওয়া স্ট্যাটাসে নাজমুল হোসেন লেখেন, “মোস্তাফিজ ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ভারতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, মাননীয় ক্রীড়া উপদেষ্টা বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরে আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচসমূহ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরে বিসিবির সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছেন। মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পর্যন্ত ক্রীড়া উপদেষ্টার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।” তিনি আরও লেখেন, “এমন এক পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের সেন্টিমেন্টের বাইরে গিয়ে ভারতীয়দের হয়ে ব্যাট করেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের জার্সিতে ১৫ হাজার রান করা এক লেজেন্ডারি ক্রিকেটার। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। প্লিজ, এই মন্তব্যকে অন্যভাবে নেবেন না।”
যদিও স্ট্যাটাসে সরাসরি তামিম ইকবালের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের জার্সিতে ১৫ হাজার রান করা লেজেন্ডারি ক্রিকেটার’—এই বর্ণনায় তামিম ইকবাল ছাড়া অন্য কারও নাম আসার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। এর আগেও নাজমুল হোসেন তামিমকে ‘ভারতীয় দালাল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে, যা নতুন করে বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
তামিম ইকবাল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল ব্যাটার। দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়া এই ক্রিকেটার দেশের হয়ে বহু ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়েছেন। তার মতো একজন সিনিয়র ও সম্মানিত ক্রিকেটারকে নিয়ে বিসিবির একজন পরিচালকের এমন মন্তব্যকে অনেকেই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভাজনমূলক বলে মন্তব্য করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে অসংখ্য ক্রিকেটভক্ত ও সাবেক খেলোয়াড় এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, একটি সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল পদে থাকা কারও এমন মন্তব্য দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ দল আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ও দ্বিপক্ষীয় সিরিজে অংশগ্রহণ করছে, তখন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসা দলীয় ঐক্যের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয়।
মোস্তাফিজ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ঝুঁকির যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিবি বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে ক্রীড়া ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার আলোচনার বিষয়টি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মতামতের নামে এমন আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে তামিম ইকবাল নিজে এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে তার ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তামিম সব সময় দেশের ক্রিকেট ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং মর্যাদাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ভারতের হয়ে বা কোনো দেশের স্বার্থে কথা বলার অভিযোগকে তারা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করছেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এই ঘটনায়। বিসিবির একজন পরিচালক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বক্তব্য দিলে বোর্ডের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বোর্ডের উচিত এ ধরনের মন্তব্যের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা।
ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়, এটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের আবেগ, গর্ব ও পরিচয়ের অংশ। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বোর্ড কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ সেই আবেগকে আঘাত করে বলে মনে করছেন ভক্তরা। তাদের মতে, মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তা প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল ইস্যু থেকে শুরু হয়ে তামিম ইকবালকে ঘিরে বিসিবি পরিচালকের মন্তব্য এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্ক কোন দিকে গড়ায় এবং বিসিবি এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।