যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্যে অগ্রগতি: ওয়াশিংটনে বৈঠক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য শুল্ক চুক্তি

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন গতি পেতে যাচ্ছে—এমনই ইঙ্গিত মিলেছে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক থেকে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বৃহস্পতিবার বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পরদিন শুক্রবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গেও পৃথক বৈঠকে অংশ নেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এসব বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন এক সময়ে হলো, যখন বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ অনিশ্চয়তায় ভরা এবং বড় বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ড. খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে নেওয়া সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও অর্জনের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠকে ড. রহমান বলেন, পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। এতে করে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে। তিনি জানান, চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনায় বর্তমান ২০ শতাংশ ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব তোলা হয়। ড. খলিলুর রহমানের যুক্তি ছিল, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে ও আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে যে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, তার স্বীকৃতি হিসেবে শুল্ক হ্রাস করা হলে উভয় দেশই লাভবান হবে। রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার এই প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেন, যা বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৈঠকে তৈরি পোশাক খাতও গুরুত্ব পায়। ড. রহমান প্রস্তাব দেন, যেসব পোশাকে মার্কিন কাঁচামাল বা উপকরণ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর ওপর থেকে মার্কিন শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হলে দুই দেশের শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর হবে। রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার এ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা স্বীকার করে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প যেমন প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবে, তেমনি মার্কিন কাঁচামাল রপ্তানিকারকদের বাজারও সম্প্রসারিত হবে।

উভয় পক্ষ দ্রুততম সময়ে পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিটি চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নের বিষয়ে একমত হয়েছে। বৈঠকে অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মতে, চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির ফলে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও বিনিয়োগের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই সম্পর্ক শুধু পণ্য বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রযুক্তি, অবকাঠামো, জ্বালানি ও সেবাখাতেও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বৈঠকে সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ও উত্থাপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিসা বন্ড’ কর্মসূচিতে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করায় দেশটির নাগরিকদের ব্যবসায়িক ভ্রমণ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে। এই সুযোগকে আরও কার্যকর করতে রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তার মতে, ব্যবসায়িক যাতায়াত সহজ হলে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আলোচনার গতি বাড়বে, যা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই ইতিবাচক।

একই সঙ্গে ড. রহমান বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স কর্পোরেশন বা ডিএফসি তহবিল প্রাপ্তির অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিল্পখাতে এই তহবিল বিনিয়োগ হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর আরও ত্বরান্বিত হবে। রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার এসব বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এই বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির পক্ষে সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নেন। উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, আলোচনার পরিবেশ ছিল গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ব্যাপারে উভয় পক্ষই বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনে এই ধারাবাহিক বৈঠক বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। সেখানে শুল্ক সুবিধা ও বাজার প্রবেশাধিকার বাড়লে দেশের রপ্তানি আয় যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশ একটি উদীয়মান বাজার ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটনের এই আলোচনা শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বৈঠক নয়; বরং এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি বাস্তব উদ্যোগ। চুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রস্তাবগুলো কার্যকর হলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রূপ পাবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত