ইরানে অগ্নিগর্ভ বিক্ষোভ: মসজিদে আগুন, পুরোনো পতাকায় প্রতিবাদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১২ বার
ইরানে মসজিদে আগুন

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ এখন আর কেবল স্লোগান বা মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং সহিংস সংঘাতে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তেহরানের একটি মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনা যেমন দেশটির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন তুলেছে, তেমনি বিক্ষোভকারীদের হাতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের পতাকা দেখা যাওয়াকে অনেকেই প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন।

রুশ সংবাদমাধ্যম তাসের প্রতিবেদনে জানানো হয়, তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি সাম্প্রতিক সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, রাজধানীতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, একটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দুটি চিকিৎসা কেন্দ্র ও অন্তত ২৬টি ব্যাংক লুটপাটের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া একটি মসজিদে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক পোস্ট ও ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পসের মিলিশিয়া বাহিনী বাসিজের সদর দপ্তরে হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে মেয়র জাকানি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। তবে তার বক্তব্যে স্পষ্ট, রাজধানীর বহু এলাকা এখনো অস্থির এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা অন্তত ১০টি সরকারি ভবন, ৪৮টি ফায়ার ট্রাক, ৪২টি বাস ও অ্যাম্বুলেন্স এবং ২৪টি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে ভাঙচুর চালিয়েছে। এসব তথ্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং অনেক জায়গায় চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ডিসেম্বর। সে দিন মধ্য তেহরানে ব্যবসায়ীরা ইরানি রিয়ালের ভয়াবহ দরপতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। প্রথমে ব্যবসায়ী মহলের এই প্রতিবাদ সীমিত পরিসরে থাকলেও খুব দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্ষোভ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের হাতে দেখা গেছে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পূর্ববর্তী সময়ের ইরানি পতাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক প্রতীক নয়; বরং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষের প্রকাশ। ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে যে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেই যেন এক ধরনের নীরব বার্তা দিচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা।

সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বারবার সাধারণ জনগণকে বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে বাবা-মায়েদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় বলা হয়, তারা যেন তাদের সন্তানদের বিক্ষোভে যেতে না দেন। ওই বার্তায় কঠোর ভাষায় সতর্ক করা হয় যে, বিক্ষোভ চলাকালে যদি গোলাগুলির ঘটনা ঘটে এবং কেউ হতাহত হয়, তাহলে সে জন্য অভিযোগ গ্রহণ করা হবে না। এই বক্তব্য দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে, সহিংসতার প্রকৃত চিত্র নিয়ে নানা ধরনের তথ্য সামনে আসছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেহরানের এক চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্রের টাইম সাময়িকীকে জানিয়েছেন, রাজধানীর অন্তত ছয়টি হাসপাতালে ২১৭ জনের লাশ এসেছে। তার দাবি অনুযায়ী, নিহতদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারা গেছেন। যদিও ইরান সরকার এই সংখ্যার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইরানে চলমান সহিংসতা ও দমন-পীড়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা, সংবাদমাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি আরোপ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।

ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিক্ষোভ কেবল তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের ফল। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্ব, সামাজিক স্বাধীনতার অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্ষোভকে আরও তীব্র করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় বলা হচ্ছে, শত্রু রাষ্ট্রগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে বিক্ষোভকারীদের উসকানি দিচ্ছে। তবে রাস্তায় নেমে আসা মানুষের ক্ষোভ যে কেবল বাইরের প্ররোচনার ফল নয়, তা অনেক পর্যবেক্ষকই স্বীকার করছেন।

তেহরানের এক বাসিন্দা, যিনি নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, “মানুষ ভয় পাচ্ছে, কিন্তু ক্ষোভ আরও বেশি। জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাই এখন কঠিন হয়ে গেছে। তাই অনেকে ঝুঁকি নিয়েই রাস্তায় নামছে।” তার এই বক্তব্য বিক্ষোভের মানবিক দিকটি স্পষ্ট করে তুলে ধরে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সরকার কঠোর দমননীতি অব্যাহত রাখলে পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। আবার রাজনৈতিক সমঝোতা বা অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে জনগণের অসন্তোষ সহজে প্রশমিত হবে না বলেও মত তাদের।

সব মিলিয়ে, মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনা ও বিপ্লব-পূর্ববর্তী পতাকার পুনরাবির্ভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ কেবল সাময়িক উত্তেজনা নয়; বরং এটি দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক সংকটময় অধ্যায়। এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোন পরিণতির দিকে যাবে, তা শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত