প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রতিবছর শীত এলেই ঢাকা শহরের আকাশ ভারী হয়ে ওঠে ধোঁয়া, ধুলা আর ক্ষতিকর কণায়। চলতি শীত মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শনিবার বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এদিন ঢাকার বায়ুমানের সূচক বা একিউআই স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৯৩, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। যদিও তালিকার শীর্ষে নেই ঢাকা, তবুও বর্তমান পরিস্থিতি নগরবাসীর জন্য স্পষ্টতই উদ্বেগজনক।
আইকিউএয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আফ্রিকার দেশ সেনেগালের রাজধানী ডাকার। শহরটির একিউআই স্কোর ৪৩৭, যা বায়ুমানের হিসাবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পর্যায়ে পড়ে। এ মাত্রার দূষণ সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে। এর পরেই রয়েছে ভারতের দিল্লি ও কলকাতা। উভয় শহরের একিউআই স্কোর ২০৬, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত। এসব শহরের সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার অবস্থান কিছুটা নিচে হলেও বাস্তবে ঢাকার বায়ু পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়।
ঢাকা শহরের বায়ুমান গত কয়েক দিনে ওঠানামা করছে। আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার ঢাকার একিউআই স্কোর ছিল ১৫৪, যা তখনও ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। শনিবার সেই স্কোর বেড়ে ১৯৩-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দূষণের মাত্রা আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে বাতাসের গতি কমে যাওয়ায় এবং কুয়াশার কারণে দূষিত কণাগুলো বাতাসে আটকে থাকে, ফলে বায়ুদূষণের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বায়ুদূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের ওপর। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই সময়ে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শীত মৌসুমে ইটভাটার কার্যক্রম বৃদ্ধি, সড়ক ও ভবন নির্মাণকাজ থেকে উড়তে থাকা ধুলাবালি, পুরোনো ও অপ্রতুল রক্ষণাবেক্ষণ করা যানবাহনের কালো ধোঁয়া—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এর সঙ্গে যোগ হয় আশপাশের শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত বর্জ্য ও ধোঁয়া। বাতাসের গতি কম থাকায় এসব দূষিত কণা সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না এবং ঢাকার আকাশে জমে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকা শহরের চারপাশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবুজায়নের অভাবও বায়ুদূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বড় বড় গাছ কেটে ফেলার ফলে বাতাস পরিশোধনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, জলাশয় ভরাট ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
একিউআই বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোরকে ভালো বায়ু হিসেবে ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ হলে সেটি মাঝারি মানের বায়ু। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোরকে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। ঢাকার বর্তমান ১৯৩ স্কোর পড়ছে ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে, যা সরাসরি ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু নির্দেশ করে। এই পর্যায়ে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে সুস্থ মানুষেরও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকা একিউআই স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অবস্থায় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং অন্যদেরও বাইরে কার্যক্রম সীমিত রাখতে বলা হয়। আর একিউআই স্কোর ৩০১ ছাড়িয়ে গেলে সেটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে। সেনেগালের ডাকার বর্তমানে সেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ঢাকা শহরের বাসিন্দারা বলছেন, শীত এলেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অনেকেই সকালবেলা হাঁটতে বা ব্যায়াম করতে বের হতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া, অফিসগামী মানুষের যাতায়াত—সবকিছুই দূষিত বাতাসের প্রভাবের মধ্যে পড়ছে। মাস্ক ব্যবহার করেও অনেক সময় স্বস্তি মিলছে না বলে অভিযোগ করেন অনেকে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও শীতকালে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, নির্মাণকাজে পানি ছিটানো, যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ—এসব উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া ঢাকার বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব নয়।
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো, বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার এবং ব্যাপক সবুজায়ন ঢাকার বায়ুমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ জরুরি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নগরবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়া, মাস্ক ব্যবহার করা এবং শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি, পর্যাপ্ত পানি পান ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমেও শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
সব মিলিয়ে, বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা আজ চতুর্থ অবস্থানে থাকলেও বাস্তবতায় এটি কোনো স্বস্তির খবর নয়। বরং প্রতিদিন বাড়তে থাকা বায়ুদূষণ রাজধানীর বাসিন্দাদের জন্য নীরব এক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। কার্যকর উদ্যোগ ও সম্মিলিত সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।