প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামী মাসে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে শুরু হতে যাওয়া টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সূচি অনুযায়ী গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচই ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা ইস্যুতে দেশটিতে দল পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিকল্প ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কায় টাইগারদের ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে একাধিক চিঠি পাঠিয়েছে বিসিবি। এই আবেদনের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিসিআইয়ের সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরানোর বিষয়টি বিসিসিআইয়ের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না; সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে আইসিসির।
মুম্বাইয়ে বিসিসিআইয়ের সাম্প্রতিক এক বৈঠক শেষে সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া বক্তব্যে দেবজিৎ সাইকিয়া বলেন, টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো আইসিসি আয়োজিত টুর্নামেন্টে কোনো দলের ভেন্যু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার নয়। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে বিসিসিআইয়ের সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এই বিষয়ে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কেবল আইসিসির। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হলো—বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে, তা নিয়ে ভারতের বোর্ড একতরফাভাবে কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিসিবি বিশ্বকাপের জন্য ১৫ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে। দল ঘোষণা করা হলেও, টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আদৌ কোন ভেন্যুতে হবে—ভারত না শ্রীলঙ্কা—তা এখনও পরিষ্কার নয়। বিসিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিবেশ বিবেচনায় তারা ভারত সফরে যেতে স্বস্তিবোধ করছেন না। এ কারণে আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন জানানো হয়েছে।
বিসিবির উদ্বেগের পেছনে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রভাব রয়েছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বিসিবি আইসিসিকে চিঠিতে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতে দল পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ছাড়া আইপিএল সংশ্লিষ্ট একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেটিও এই অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে বলে ক্রীড়া অঙ্গনে আলোচনা চলছে। আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অভিযোগ উঠেছে, ওই সিদ্ধান্তের পেছনে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার প্রভাব রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিসিবি বিশ্বকাপে ম্যাচ ভেন্যু নিয়ে বাড়তি সতর্কতা দেখাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার মুম্বাইয়ে বিসিসিআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা সেন্টার অব এক্সেলেন্সের (সিওই) কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং যুব ক্রিকেটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিসিসিআই সভাপতি মিথুন মানহাস, সহ-সভাপতি রাজীব শুক্লা, সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া এবং সিওই প্রধান ভিভিএস লক্ষ্মণ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে সাইকিয়া বলেন, বাংলাদেশ দলের অনুরোধটি বিসিসিআইয়ের আলোচ্যসূচির মধ্যে ছিল না এবং এটি তাদের এখতিয়ারেও পড়ে না। তার ভাষায়, আইসিসিই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশ্বকাপের আয়োজক কাঠামো অনুযায়ী, ভারত ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে এই আসর আয়োজন করছে। সূচি প্রণয়ন, ভেন্যু নির্ধারণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই আইসিসির তত্ত্বাবধানে হয়। সাধারণত কোনো দল ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন জানালে আইসিসি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। অতীতে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভেন্যু বদলানোর নজির রয়েছে, তবে সেসব ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ এবং বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নয়, ক্রীড়াগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচই যদি ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরানো হয়, তবে পিচ, কন্ডিশন এবং দর্শকসমর্থনের ধরন বদলে যাবে। শ্রীলঙ্কার কন্ডিশনে বাংলাদেশের খেলার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও, হঠাৎ ভেন্যু পরিবর্তন প্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। আবার ভারতে খেলতে হলে সেখানে নিরাপত্তা, যাতায়াত ও মানসিক চাপের বিষয়গুলোও মাথায় রাখতে হচ্ছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বিসিবির এই অবস্থান একদিকে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা, অন্যদিকে প্রশাসনিক দৃঢ়তার প্রকাশ। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তেজনার প্রতিফলন মাঠের খেলায় পড়লে তা খেলাধুলার স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আইসিসির উচিত হবে, সব পক্ষের উদ্বেগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যাতে টুর্নামেন্টের ন্যায্যতা ও প্রতিযোগিতার ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ থাকে।
বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও, ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে—খেলোয়াড়রা মূলত নিরাপত্তা ও পারফরম্যান্সের ভারসাম্য চান। তাদের মতে, নিরাপদ পরিবেশে মনোযোগ দিয়ে খেলতে পারাটাই সবচেয়ে জরুরি। অন্যদিকে সমর্থকদের একটি অংশ মনে করছে, ক্রিকেট মাঠে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক টানাপোড়েন না এনে খেলাটাকে খেলাই থাকতে দেওয়া উচিত। আবার অনেকেই বিসিবির সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল বলে দেখছেন।
ভারতীয় বোর্ডের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তারা এই বিষয়ে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী নয়। বিসিসিআইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল কর্তৃপক্ষ আইসিসি; ফলে তাদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত এলেই কেবল বাস্তবায়নের প্রশ্ন আসবে। এতে বোঝা যায়, বিষয়টি এখন পুরোপুরি আইসিসির কোর্টে।
আইসিসির সামনে সিদ্ধান্তটি সহজ নয়। একদিকে আয়োজক দেশের সঙ্গে চুক্তি, সূচি ও লজিস্টিকস; অন্যদিকে একটি অংশগ্রহণকারী দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ—দুটির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। টুর্নামেন্টের অল্প সময় বাকি থাকায় দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজনে আইসিসি নিরাপত্তা মূল্যায়ন, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদন এবং উভয় বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে পারে।
সব মিলিয়ে, “বাংলাদেশের ম্যাচ সরানো ভারতের এখতিয়ারে পড়ে না”—বিসিসিআই সেক্রেটারির এই বক্তব্য একটি প্রশাসনিক বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ক, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক ক্রিকেট প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার জটিলতা। সামনে আইসিসির সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ যাত্রা কোন পথে এগোবে—ভারতের মাটিতে, নাকি শ্রীলঙ্কার ভেন্যুতে। তবে যেখানেই হোক, ক্রিকেটপ্রেমীরা প্রত্যাশা করছেন, মাঠের লড়াই হবে ক্রিকেটীয় দক্ষতায়, কোনো অপ্রাসঙ্গিক উত্তেজনায় নয়।