প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
পৃথিবীর সব শব্দ থেমে যায় যখন কিশোরী কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক আর্তি—”আমরা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?” এই প্রশ্নটি শুধুমাত্র একটি সন্তানের নয়, এটি একটি পরিবারের, একটি শ্রেণির, একটি সমাজ ব্যবস্থার, যেখানে চাঁদা না দেওয়ার অপরাধে প্রকাশ্যে পাথর মেরে হত্যা করা হয় একজন সংগ্রামী মানুষকে।
ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় সংঘটিত নির্মম এ হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ। যিনি দীর্ঘদিন ধরে “মেসার্স সোহানা মেটাল” নামের দোকান পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীত্ব এবং সফলতায় ঈর্ষান্বিত একটি চাঁদাবাজ গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে তাকে দুই লাখ টাকা মাসিক চাঁদা দিতে চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু সোহাগ তা দিতে রাজি হননি। তার এই দৃঢ় অবস্থানই তাকে প্রাণ দিতে বাধ্য করল।
পূর্ব ইতিহাস জানাচ্ছে, সোহাগ জন্মগ্রহণ করেন বরগুনা জেলার ইসলামপুর এলাকায়। মাত্র সাত মাস বয়সে বজ্রপাতে হারান পিতা আইউব আলীকে। তারপর মা আলেয়া বেগম তার তিন সন্তানকে নিয়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। কঠিন বাস্তবতার ভেতর বেড়ে উঠা সোহাগ ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন এক পরিশ্রমী ও স্বাবলম্বী ব্যবসায়ী হিসেবে। তার স্বপ্ন ছিল পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তিতে বাঁচার, একটি সুন্দর ভবিষ্যতের।
কিন্তু সেই স্বপ্ন চুরমার করে দেয় নির্মমতার এক কালো বিকেল। গত বুধবার মিটফোর্ডে সোহাগের বাসা থেকে তাকে ডেকে নেয় একদল চাঁদাবাজ। তারা আবারও দাবি তোলে অর্থের। কিন্তু সোহাগ ‘না’ বলায় তাকে আটকে রেখে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। একপর্যায়ে মাথায় বারবার পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। এই পাশবিকতা ঘটে ঢাকার মতো ব্যস্ত জনপদে, শত মানুষের উপস্থিতিতেই।
সোহাগের নিথর দেহ যখন বরগুনার মাতৃভূমিতে ফিরে আসে, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। গ্রামের মানুষ ভিড় করে তার বাড়িতে। জানাজা শেষে ইসলামপুর গ্রামের মাটিতে, মায়ের কবরের পাশে, তাকে চিরশায়িত করা হয়।
নিহতের বড় বোন ফাতেমা জানান, “আমার ভাইকে অনেক দিন ধরেই হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তারা দোকান দখল করতে চেয়েছিল। ভাই রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত তারা যা বলেছিল, তাই করল—খুন করে ফেলল।”
সোহাগের স্ত্রী লাকি বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “ওরা শুধু মেরে ফেলেনি, মৃত্যুর পরও বারবার পাথর দিয়ে আঘাত করেছে তার মাথায়। আমি এই নরপশুদের বিচার চাই। আমি রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাই।”
আর এই সব কিছুর মাঝখানে, পুরো ঘটনার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে এক নিষ্পাপ কিশোরী মেয়ে—সোহানা। বাবাকে হারিয়ে দিশেহারা সে। চোখের পানি ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু কষ্ট ফুরায়নি। তার কণ্ঠে উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন, যা সারাদেশের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট—“আমরা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?”
এই প্রশ্ন শুধু একটি সন্তানের নয়—এটি রাষ্ট্রের কাছে, সমাজের কাছে, প্রশাসনের কাছে এবং সকল সচেতন মানুষের কাছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। যে দেশে একজন নিরীহ, পরিশ্রমী ব্যবসায়ী কেবল চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় জীবন দিতে বাধ্য হন, সেই দেশে নিরাপত্তা কোথায়? বিচার কোথায়?
এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারকে নিঃস্ব করেনি, একটি স্বপ্নকে রক্তাক্ত করেনি—এটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও নৈতিকতার ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি এখন জনগণের একটাই প্রত্যাশা—এই বর্বরতা যেন কোনোভাবেই সহ্য না করা হয়। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে প্রমাণ হোক, এই দেশ এখনো ন্যায়ের পক্ষে। এখনো এখানে ‘না’ বলার অধিকার বেঁচে আছে। এখনো কোনো সন্তানের প্রশ্ন—“আমরা কোথায় যাব?”—শুধু শূন্যে ঝুলে থাকে না।