প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি) বর্তমানে এক গভীর প্রশাসনিক ও নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গ্রুপিংয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পাসজুড়ে বিরাজ করছে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মচারীদের ওপর।
এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭তম রিজেন্ট বোর্ডের সভা ও একই মাসে অনুষ্ঠিত পদোন্নতির বাছাই বোর্ডকে কেন্দ্র করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই রিজেন্ট বোর্ডের সভায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মধ্যে মতানৈক্য তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নেয়। উপ-উপাচার্যের পক্ষের অভিযোগ, রিজেন্ট বোর্ডের সভায় যে সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়নি, সেগুলো বোর্ডের নাম ব্যবহার করে অফিস আদেশ জারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বিশেষ করে আলোচ্যসূচির ৭ নম্বর এজেন্ডা ঘিরে উত্তেজনা চরমে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বাছাই বোর্ডে সুপারিশপ্রাপ্ত ২৪ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তার মধ্যে ২১ জনের পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন স্থগিত রেখে মাত্র তিনজনের ক্ষেত্রে তা অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে করে একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বাছাই বোর্ডের সুপারিশের পর উপাচার্য নতুন করে আরেকটি কমিটি গঠন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি-বিধানের পরিপন্থী। পুনরায় আবেদন ও ব্যক্তিগত ফাইল পর্যালোচনার মাধ্যমে ওই কমিটি ২৪ জনের পরিবর্তে মাত্র তিনজনকে পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়নের জন্য সুপারিশ করে।
এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের একটি অংশ উপাচার্যের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলে। বিশেষ করে উপ-উপাচার্যের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. এবিএম সাইফুল ইসলামের পদোন্নতি এবং অধ্যাপক জামাল হোসেনের স্ত্রী জিনাত নাসরিন সুলতানার সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের বিষয়টি রিজেন্ট বোর্ডে অনুমোদন না পাওয়ায় অসন্তোষ আরও বাড়ে। এসব সিদ্ধান্ত নিজেদের অনুকূলে না আসায় শিক্ষক সমাজের একটি অংশ প্রকাশ্যে রিজেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান তথা উপাচার্যের বিরুদ্ধে দোষারোপ শুরু করেন। এর ফলে পবিপ্রবির শিক্ষকরা স্পষ্টভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন।
এই বিভাজনের প্রকাশ্য রূপ দেখা যায় বিজয় দিবস উদযাপনের সময়। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য গ্রুপ আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল ঘটনা বলে মনে করছেন অনেকে। এতদিন যাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, সেই উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দূরত্ব তখন সবার চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শীতকালীন অবকাশ শেষে ২৮ ডিসেম্বর ক্যাম্পাস খুললে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। উপ-উপাচার্য গ্রুপ রেজিস্ট্রার অপসারণের দাবিতে উপাচার্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। একপর্যায়ে রেজিস্ট্রারকে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে উপ-উপাচার্যের অনুসারী এক শিক্ষক কর্তৃক হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি রেজিস্ট্রার উপাচার্যকে জানালে তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে ১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেন।
একই সময় অতীতে কর্মকর্তা মারধরের ঘটনায় পদাবনতি পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন মিঠু ও মাহমুদ আল জামানের শাস্তি মওকুফ করা হয়। এসব সিদ্ধান্তে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মধ্যে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়। একসময়কার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দ্রুত রূপ নেয় তীব্র বিরোধে, যার প্রভাব পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে।
রেজিস্ট্রার অপসারণের পর উপ-উপাচার্য গ্রুপ উপাচার্যের কাছে নতুন করে একাধিক দাবি উত্থাপন করে। এর মধ্যে স্থগিতাদেশপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়োন্নয়ন, ড. সাইফুল ইসলামের পদোন্নতি, অধ্যাপক জামালের স্ত্রীর চাকরি বহাল এবং কয়েকটি অ্যাডহক নিয়োগের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব দাবি পূরণে উপাচার্যকে এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। এমনকি দাবি মানা না হলে উপাচার্যের বাসভবনে তালা দেওয়ার হুমকি এবং গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যেই ৫ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহানের প্রকাশ্য বাগ্বিতণ্ডা হয়। উপ-উপাচার্য ডিনের বিরুদ্ধে শিক্ষা উপকরণের বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে উপ-উপাচার্য গ্রুপ ড. দেলোয়ারের পদত্যাগের দাবিতে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে। এতে করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মধ্যস্থতার আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় বরিশালে উপাচার্যের নিজ বাসভবনে উপ-উপাচার্য গ্রুপের সঙ্গে একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপাচার্য ড. দেলোয়ারকে ডিন পদ থেকে অপসারণসহ কয়েকটি দাবি মেনে নেন বলে জানা যায়।
৭ জানুয়ারি সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ক্যাম্পাসে এসে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। বৈঠকে অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনকে ডিন হিসেবে স্বপদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে আলতাফ হোসেন ও উপাচার্য ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। তবে নাটকীয়ভাবে সেদিনই রেজিস্ট্রার ড. হাবিবুর রহমানের স্বাক্ষরে ড. দেলোয়ারকে ডিন পদ থেকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে অধ্যাপক জহুরুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তে ক্যাম্পাস পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের কারণে ক্লাস, গবেষণা ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। অনেক শিক্ষক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পবিপ্রবিকে এই অচলাবস্থা থেকে বের করে আনতে হবে, নতুবা এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে অপূরণীয়।