ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্প, আতঙ্কে দক্ষিণাঞ্চল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫০ বার
ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্প, আতঙ্কে দক্ষিণাঞ্চল

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ ফিলিপাইনে আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের দাভাও অক্সিডেন্টাল উপকূলের কাছে শনিবার রাতে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় বিস্তীর্ণ এলাকায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ মাটি কেঁপে ওঠায় ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন হাজারো মানুষ। যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানি বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবু শক্তিশালী এই কম্পন সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে ভয় ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে।

ফিলিপাইনের ইনস্টিটিউট অব ভলকানোলজি অ্যান্ড সিসমোলজি (ফিভোলক্স) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১০টা ৫৮ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল সারাঙ্গানি পৌরসভার বালুট দ্বীপ থেকে প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের গভীরতা তুলনামূলক কম হওয়ায় এর কম্পন বিস্তৃত এলাকায় অনুভূত হয়েছে। খবরটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।

ফিভোলক্সের তথ্যমতে, শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হলেও ফিলিপাইনের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে সুনামির কোনো আশঙ্কা নেই। কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ তথ্য জানিয়ে জনগণকে কিছুটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। কারণ, অতীতে ভূমিকম্পের পর সুনামির আশঙ্কায় উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরনের আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে। এবার সুনামির সতর্কতা জারি না হওয়ায় মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেলেও ভূমিকম্পের ভয়াবহ স্মৃতি অনেককেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

দক্ষিণ ফিলিপাইনের একাধিক প্রদেশে ভূমিকম্পের কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। সারাঙ্গানি প্রদেশের মালুঙ্গন ও কিয়াম্বা এলাকায় বহু মানুষ ঘরবাড়ি কেঁপে উঠতে দেখেন। একইভাবে দক্ষিণ কোটাবাটো প্রদেশের টুপি ও করোনাডাল শহর এবং সুলতান কুদারাত প্রদেশের পালিমবাং এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিওতে দেখা যায়, অনেক মানুষ আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন এবং কেউ কেউ খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।

ভূমিকম্পের সময় অনেক ভবনে থাকা মানুষ তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করেন। কিছু এলাকায় আলমারি, জানালা ও ঝুলন্ত সামগ্রী কেঁপে ওঠে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। রাতের বেলা হওয়ায় অনেকেই তখন ঘুমিয়ে ছিলেন, ফলে হঠাৎ কম্পনে জেগে ওঠেন তারা। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্কের মাত্রা ছিল বেশি। অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

ভূমিকম্পের পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আফটারশক বা পরবর্তী ছোটখাটো কম্পনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে কারণে জনগণকে সতর্ক থাকার এবং অপ্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ফিলিপাইনের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তারা ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর না এলেও কিছু এলাকায় দেয়ালে ফাটল বা ছোটখাটো ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ফিলিপাইন একটি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশটি ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’-এর মধ্যে অবস্থিত, যেখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। এই অঞ্চলে টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়ার কারণে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিপাইনে মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে প্রতিটি ভূমিকম্পই নতুন করে ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ভূকম্পবিদরা বলছেন, ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পকে শক্তিশালী হিসেবে ধরা হয়। এ ধরনের ভূমিকম্পে যদি জনবহুল এলাকায় বা অগভীর গভীরতায় আঘাত হানে, তবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। সৌভাগ্যবশত, এবারের ভূমিকম্পটি তুলনামূলকভাবে সমুদ্র এলাকায় এবং জনবসতি থেকে কিছুটা দূরে সংঘটিত হওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন কয়েকদিন পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে। এসব আফটারশক কখনো কখনো দুর্বল হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন বা অবকাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই স্থানীয় জনগণকে সচেতন থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ফিলিপাইনের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটির জন্য বড় বাস্তবতা। ২০১৩ সালে বোহোল প্রদেশে সংঘটিত শক্তিশালী ভূমিকম্পে শত শত মানুষ নিহত হয়েছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো অনেকের মনে তাজা। ফলে নতুন করে শক্তিশালী ভূমিকম্পের খবর এলেই মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

মানবিক দিক থেকেও ভূমিকম্পের প্রভাব গভীর। অনিশ্চয়তা ও ভয় মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষরা এ ধরনের ঘটনায় বেশি ভীত হয়ে পড়েন। অনেক পরিবার রাত কাটিয়েছে আতঙ্কের মধ্যে, ভবিষ্যতে আবার কম্পন হবে কি না—এই আশঙ্কায় ঘুমাতে পারেননি অনেকেই।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে ফিলিপাইনে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও সচেতনতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা, নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম মানুষের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে, দাভাও অক্সিডেন্টাল উপকূলে আঘাত হানা ৬ দশমিক ৮ মাত্রার এই ভূমিকম্প আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষের অসহায়ত্বের কথা। যদিও বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে, তবু সতর্কতা ও প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। ফিলিপাইনের মানুষ এখন আশায় আছে—পরবর্তী সময় যেন কোনো বড় আফটারশক বা দুর্যোগ না আসে এবং স্বাভাবিক জীবন দ্রুত ফিরে আসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত