চবিতে আটক ‘আওয়ামীপন্থি’ শিক্ষক, ৯ ঘণ্টা পর মুক্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৩ বার
চবিতে আটক ‘আওয়ামীপন্থি’ শিক্ষক, ৯ ঘণ্টা পর মুক্তি

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে আইন বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপককে আটক ও পরে মুক্তির ঘটনা ক্যাম্পাসজুড়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যা সমর্থন, শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত করার অভিযোগে অভিযুক্ত আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মাহমুদ রোমান শুভকে শিক্ষার্থীরা আটক করে প্রশাসনের হাতে তুলে দেন। তবে প্রায় ৯ ঘণ্টা পর কোনো মামলা ছাড়াই তাকে ক্যাম্পাস ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা, তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরের দিকে ঘটনাটি ঘটে। জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান মাহমুদ রোমান শুভের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে থেকেই একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলমান রয়েছে। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি ওই দিন ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় আইন অনুষদের গ্যালারি-১ কক্ষে পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, তদন্তাধীন অবস্থায় তাকে পরীক্ষার দায়িত্বে রাখাই প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার পরিচয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) সংশ্লিষ্ট নেতারা পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষকের উপস্থিতি টের পান। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চাকসু নেতাদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি সেখান থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। কিছুদূর ধাওয়া করে তাকে আটক করা হয় এবং দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে প্রক্টর অফিসে হস্তান্তর করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা ক্যাম্পাসের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

আটকের পর শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় অভিযুক্ত শিক্ষক সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরোধিতা করেন এবং সহিংস দমনকে নৈতিক সমর্থন দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত করার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি।

চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাঈদ বিন হাবিব এ বিষয়ে বলেন, তারা আইনগত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ জানাতে হাটহাজারী থানায় মামলা করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের জানানো হয়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া মামলা গ্রহণ করা যাবে না। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সেখানে মামলা দায়েরের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। প্রশাসন তাদের জানিয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

থানায় মামলা করতে না পারার অভিজ্ঞতা নিয়ে চাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদ বলেন, তারা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করেও হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মামলা নিতে রাজি করাতে পারেননি। তার ভাষায়, গ্রেপ্তার তো দূরের কথা, একটি নিয়মিত মামলাও গ্রহণ করা হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্ত শিক্ষককে প্রথমে প্রক্টর অফিসে রাখে। পরে তাকে প্রশাসনিক ভবনে উপ-উপাচার্যের (একাডেমিক) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর প্রক্টরের গাড়িতে করে তাকে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে দেওয়া হয়। রাত ৯টার দিকে তিনি ক্যাম্পাস ছাড়েন বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। মুক্তির সময় কোনো ধরনের লিখিত ব্যাখ্যা বা জনসমক্ষে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজের একাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আইন অনুযায়ী তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, পুরো ঘটনাটি সংবেদনশীল এবং শিক্ষার্থীদের আবেগ ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই ঘটনায় ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদল শিক্ষার্থী মনে করছেন, গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত শিক্ষককে ৯ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, এতে তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটিও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের জটিলতা আবারও সামনে এনেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো সংবেদনশীল জাতীয় ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগ হলে তা আরও সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করা না গেলে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস বাড়তে পারে।

মানবিক দিক থেকেও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আবার একজন শিক্ষক হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হাসান মাহমুদ রোমান শুভকে আটক ও পরে মুক্তির ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি, আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্তের ফলাফল কী আসে এবং প্রশাসন পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর ক্যাম্পাসবাসী ও সাধারণ মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত