প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় এক ধান ব্যবসায়ীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম হামিদুল মণ্ডল (৩৮)। তিনি শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয়ভাবে একজন পরিচিত ধান ব্যবসায়ী ছিলেন। রোববার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে গ্রামের ধানের ক্ষেতে তার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরের দিকে কয়েকজন কৃষক মাঠে কাজ করতে গিয়ে ধানের ক্ষেতে একটি লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে তারা নিশ্চিত হন, লাশটি গ্রামেরই পরিচিত মুখ হামিদুল মণ্ডলের। তার নাক ও শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তের দাগ ছিল, যা দেখে প্রথম দর্শনেই সন্দেহ তৈরি হয় যে এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে ভিড় জমে যায়, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা গ্রাস করে পুরো গ্রামকে।
নিহত হামিদুল মণ্ডল ছিলেন মোন্তাজ মণ্ডলের ছেলে। পরিবার ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ধান কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং স্থানীয় হাটবাজারে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। শনিবার বিকেলে তিনি টাকা লেনদেনসংক্রান্ত কাজে বাড়ি থেকে বের হন। সে সময় পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, কিছু হিসাব মেটাতে হবে এবং রাতে ফিরতে দেরি হতে পারে। কিন্তু রাত গড়িয়ে গেলেও তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো কোথাও রাত কাটিয়েছেন। কিন্তু পরদিন সকালে ধানের ক্ষেতে তার লাশ উদ্ধারের খবর আসতেই সব আশা ভেঙে যায়।
ঘটনার পরপরই শেরপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এলাকাটি ঘিরে রাখে এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ লক্ষ্য করে, শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে এগুলো কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরে লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইব্রাহীম আলী সাংবাদিকদের জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই জানা যাবে, এটি হত্যা না কি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং নিহতের শেষ গতিবিধি, আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত শত্রুতার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হামিদুল মণ্ডল ছিলেন সাধারণভাবে শান্ত স্বভাবের মানুষ। কারও সঙ্গে বড় ধরনের বিরোধ ছিল বলে তারা জানেন না। তবে ধান ব্যবসার কারণে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তার নিয়মিত আর্থিক লেনদেন ছিল। কেউ কেউ ধারণা করছেন, ব্যবসায়িক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এই ঘটনা ঘটতে পারে। আবার কেউ বলছেন, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এসবই আপাতত অনুমান, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত সত্য জানা সম্ভব নয়।
গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, এমন একটি ঘটনা এলাকায় আগে কখনও ঘটেনি। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ধানের ক্ষেতে লাশ পড়ে থাকার দৃশ্য তাদের মানসিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং রাতে একা চলাচল নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনাটিকে দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন এবং দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
হামিদুলের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই ঘটনা নেমে এসেছে এক গভীর শোকের ছায়া হয়ে। স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তার মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তারা পুলিশের তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পেছনে কোনো আর্থিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা বা পরিকল্পিত অপরাধ আছে কি না—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। নিহতের মোবাইল ফোন কললিস্ট, শেষ অবস্থান এবং যাদের সঙ্গে তিনি সর্বশেষ দেখা করেছিলেন, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে সেগুলো সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ একে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করছেন, আবার কেউ দুর্ঘটনা কিংবা অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনার কথাও বলছেন। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে গুজবে কান না দিয়ে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শেরপুর উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের অপরাধের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও, এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা গেলে মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে এই রহস্যের জট খুলবে কি না। একটি পরিবারের জীবনে নেমে আসা এই ট্র্যাজেডি শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, পুরো এলাকার জন্যই একটি সতর্কবার্তা। হামিদুল মণ্ডলের মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।