প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তীব্র হিমেল বাতাসে মুখ জমে আসছে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে সাদা ধোঁয়া উড়ছে আকাশে। পায়ের নিচে কচকচে শব্দ তুলে ভাঙছে বরফের স্তর। সেই শীতল পরিবেশেই হাসি, উচ্ছ্বাস আর বিস্ময়ে ভরে উঠেছে চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হেইলংজিয়াং প্রদেশের রাজধানী হারবিন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শীতকালীন আয়োজন ‘হারবিন আইস অ্যান্ড স্নো ফেস্টিভাল’-এ যেন বাস্তবের পৃথিবী পেছনে ফেলে দর্শনার্থীরা ঢুকে পড়ছেন এক রূপকথার রাজ্যে।
প্রতি বছরের মতো এবারও শীতের তীব্রতাকে সঙ্গী করে হারবিন শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে বরফ ও তুষারের এক বিস্ময়কর সাম্রাজ্য। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় উৎসবটির ২৭তম আয়োজন। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আ ফেইরি টেল ওয়ার্ল্ড’, অর্থাৎ রূপকথার জগৎ। নামের মতোই পুরো আয়োজন সাজানো হয়েছে কল্পনা, শিল্প আর আলো-ছায়ার মায়াবী মিশেলে।
চার লাখেরও বেশি কিউবিক মিটার বরফ ও তুষার ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল বিশাল ভাস্কর্য। কোথাও দেখা যাচ্ছে বরফে গড়া একটি সম্পূর্ণ স্টিম ট্রেন, যেন যে কোনো মুহূর্তে হুইসেল বাজিয়ে যাত্রা শুরু করবে। কোথাও আবার দাঁড়িয়ে আছে রাশিয়ার ঐতিহাসিক ক্রেমলিন দুর্গের আদলে তৈরি বরফপ্রাসাদ। এসব ভাস্কর্যের পাশে রয়েছে বরফের স্লাইড, ঘোড়ার মূর্তি, রূপকথার চরিত্র, দুর্গ ও কল্পনার নগরী। দিনের আলোয় সূর্যের আলো পড়ে এসব ভাস্কর্য ঝলমল করে ওঠে, আর রাত নামলেই রঙিন আলোর কারুকাজে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে স্বপ্নিল।
হারবিনের এই বরফ উৎসব শুধু শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জায়গা নয়, এটি এক ধরনের অভিজ্ঞতা। তীব্র ঠান্ডাকে উপেক্ষা করেই শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ এখানে এসে বরফের মাঝে খেলছেন, গড়াগড়ি দিচ্ছেন, ছবি তুলছেন। আট বছরের শিশু শিই চেং চোখ বড় বড় করে জানায়, এত সুন্দর জায়গা সে আগে কখনও দেখেনি। তার মতে, একদিনে সব দেখা সম্ভব নয়, অন্তত তিন দিন সময় দরকার। শিশুটির এই সরল মন্তব্যেই ধরা পড়ে উৎসবটির ব্যাপ্তি ও আকর্ষণ।
শিই চেংয়ের বাবা চেং বলেন, তিনি সাধারণত প্রতি বছর এখানে আসতে পারেন না। বেশির ভাগ সময় ভিডিও বা ছবিতে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কিন্তু এবার সামনে থেকে দেখে মনে হয়েছে, বরফও যে এত বৈচিত্র্যময় শিল্পের ভাষা হতে পারে, তা কল্পনাতীত। একজন দর্শনার্থী হিসেবে এই অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে।
উৎসবস্থলে ঘুরে দেখা যায়, কেউ পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও করছেন, আবার কেউ বরফের মধ্যে শুয়ে পড়ছেন শিশুসুলভ আনন্দে। পর্যটকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই হারবিন উৎসবকে অন্য অনেক প্রদর্শনী থেকে আলাদা করে তোলে। এখানে দর্শনার্থীরা শুধু দর্শক নন, বরং উৎসবের অংশ।
এবারের আয়োজনে বিশেষ নজর কেড়েছে কিছু ভিন্নধর্মী ভাস্কর্য। বরফের মধ্যে ফুটে উঠেছে লাল, গোলাপি ও নীল রঙের গোলাপ, যা তুষারের সাদা জগতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। পাশাপাশি বরফ দিয়ে নির্মিত হয়েছে চীনের বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক নেতাদের ভাস্কর্য, যা দেশটির ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে উৎসবকে যুক্ত করেছে আরও দৃঢ়ভাবে।
শুধু চোখের আনন্দেই সীমাবদ্ধ নয় হারবিন আইস অ্যান্ড স্নো ফেস্টিভাল। এখানে রয়েছে নানা ধরনের শীতকালীন বিনোদনের আয়োজন। এবারের উৎসবে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে বরফশীতল পানিতে সাঁতার কাটার সুযোগ। প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী অনেকেই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছেন, যা দর্শকদের জন্য যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উৎসবের বৈচিত্র্যও বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হারবিনের এই বরফ উৎসব চীনের পর্যটন শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতি বছর দেশি-বিদেশি লাখো পর্যটক এই উৎসবে অংশ নিতে হারবিনে ভিড় করেন। শীতপ্রধান এই শহরটি বছরের এই সময়টায় পরিণত হয় আন্তর্জাতিক পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দুতে। স্থানীয় অর্থনীতি, হোটেল, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য এই উৎসব বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
হারবিন শহরের ভৌগোলিক অবস্থানও এই উৎসবের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। শীতকালে এখানকার তাপমাত্রা অনেক সময় মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, যা বরফ ভাস্কর্য দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। শিল্পীরা মাসের পর মাস কঠোর পরিশ্রম করে এসব ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। দিনের পর দিন বরফ কেটে, খোদাই করে তারা প্রাণ দেন এই শীতল শিল্পকর্মে।
রাতের বেলায় আলো-ছায়ার খেলায় উৎসবস্থল যেন নতুন রূপ নেয়। রঙিন বাতির আলোয় বরফের দুর্গগুলো কখনও নীল, কখনও বেগুনি, কখনও সোনালি আভায় ঝলমল করে ওঠে। অনেক দর্শনার্থীর কাছে এই রাতের দৃশ্যই সবচেয়ে স্মরণীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত, যা আরও বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করছে হারবিনের দিকে।
উৎসব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের আয়োজন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দর্শনার্থীরা আরও দীর্ঘ সময় ধরে এই বরফের রাজ্য উপভোগ করতে পারবেন। নিরাপত্তা ও পর্যটকসেবায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে তীব্র শীতের মধ্যেও সবাই নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।
হারবিন আইস অ্যান্ড স্নো ফেস্টিভাল প্রমাণ করে, প্রকৃতির কঠিন পরিবেশকেও শিল্প ও কল্পনার মাধ্যমে আনন্দের উৎসে পরিণত করা যায়। বরফ, যা অনেকের কাছে কেবল শীতের প্রতীক, হারবিনে এসে তা হয়ে ওঠে গল্প, রূপকথা আর মানুষের মিলনমেলা। এই উৎসব শুধু চীনের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শীতকালীন উৎসবের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।