প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। শনিবার প্রকাশিত এক নিরাপত্তা বিজ্ঞপ্তিতে দেশটির নাগরিকদের “অবিলম্বে” ভেনেজুয়েলা ত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, যেখানে অস্ত্রধারী মিলিশিয়াদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং রাস্তার বিভিন্ন চেকপয়েন্টে মার্কিন নাগরিকদের শনাক্ত করার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের সতর্কবার্তায় বলা হয়, ভেনেজুয়েলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিলিশিয়ারা সক্রিয়ভাবে চেকপয়েন্ট স্থাপন করে গাড়ি থামাচ্ছে এবং যাত্রীদের পরিচয় যাচাই করছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিক বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনের কোনো প্রমাণ থাকলে তা তাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এই সতর্কতা এমন এক সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সতর্কবার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, যেহেতু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো পুনরায় চালু হয়েছে, তাই ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের দেরি না করে দেশ ত্যাগ করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় তাদের কূটনৈতিক ও কনসুলার কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাও সীমাবদ্ধ। এই বাস্তবতায় নাগরিকদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচল এড়িয়ে চলতে হবে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলায় অবস্থান করা মানেই বাড়তি ঝুঁকি গ্রহণ করা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক চাপ দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিদেশি নাগরিকদের, বিশেষ করে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি নজরদারি ও হয়রানির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, রাস্তার চেকপয়েন্টে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম কিংবা ব্যক্তিগত কাগজপত্র তল্লাশি করছে। এতে কোনো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হলে তার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এমনকি ভুল বোঝাবুঝি বা রাজনৈতিক সন্দেহ থেকেও সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার সরকারি কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের এই সতর্কবার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি “স্থিতিশীল ও শান্ত” এবং বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে কোনো বিশেষ হুমকি নেই। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের সতর্কতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে দেশটির ভেতরে ও বাইরে থাকা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
ভেনেজুয়েলায় বসবাসরত কিছু বিদেশি নাগরিকের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন শহরের প্রবেশপথে ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিরাপত্তা তল্লাশি বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সশস্ত্র লোকজন পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য করছে এবং সন্দেহভাজন মনে হলে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। যদিও এসব ঘটনাকে সরকার নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখাচ্ছে, তবুও বিদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন নাগরিকদের জন্য এই সতর্কতা শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকির কথাই নয়, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে কনসুলার সেবায়। জরুরি অবস্থায় পাসপোর্ট হারানো, গ্রেপ্তার বা চিকিৎসা সহায়তার মতো বিষয়গুলোতে দ্রুত সাহায্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই স্টেট ডিপার্টমেন্ট নাগরিকদের ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই সতর্কবার্তা ভেনেজুয়েলার ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর একটি অংশও হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন। ভেনেজুয়েলায় চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর সতর্কতা বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাধারণ ভেনেজুয়েলান নাগরিকদের জন্যও এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিদেশি নাগরিকদের দেশত্যাগের আহ্বান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যটন, ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এই সতর্কতা শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়, বরং ভেনেজুয়েলার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সমাজের উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই জরুরি আহ্বান ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকার দাবি করছে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সতর্কতা বলছে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুই বিপরীত বয়ানের মাঝখানে সাধারণ মানুষ ও বিদেশি নাগরিকরা পড়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। এখন দেখার বিষয়, ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।