গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের হুমকি, ইউরোপের প্রস্তুতি কী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের হুমকি, ইউরোপের প্রস্তুতি কী

প্রকাশ:  ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রকাশ্য হুমকি ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে যে কৌশলগত আস্থা ও মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, এই হুমকি সেই কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইউরোপের নেতারা প্রকাশ্যে এখনো সরাসরি পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের কথা না বললেও, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক তৎপরতা, সামরিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ইউরোপ একটি সম্ভাব্য বড় সংকটের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছে।

গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্য ইউরোপে বিস্ময় ও উদ্বেগ—দুটিই তৈরি করেছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় থাকা উচিত এবং প্রয়োজনে “সহজ উপায়” অথবা “কঠিন উপায়”—দুটোর যেকোনোটি বেছে নেওয়া হতে পারে। এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ছাড়িয়ে যায়নি, বরং ন্যাটো জোটের ভেতরেই এক ধরনের অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করেছে। কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, আর ডেনমার্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসন ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডকে জোর করে দখলের যেকোনো চেষ্টা ন্যাটো জোটের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তাঁর মতে, যদি এক ন্যাটো সদস্য আরেক ন্যাটো সদস্যের ভূখণ্ডের ওপর আগ্রাসনের হুমকি দেয়, তাহলে সেই জোটের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি টিকে থাকা কঠিন। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিরল এক কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ হলে দেশটির সৈন্যরা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে এবং সে ক্ষেত্রে আলাদা কোনো নির্দেশের অপেক্ষা করা হবে না।

ইউরোপের অন্যান্য দেশও বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছে না। ফ্রান্স ও জার্মানি ডেনমার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ শুরু করেছে। ইউরোপীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের মুখে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া জানানো ছাড়া ইউরোপের সামনে আর কোনো বাস্তব বিকল্প নেই। যদিও ফ্রান্স ও ইতালির কিছু নীতিনির্ধারক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হামলার পথে নাও যেতে পারে, তবু ঝুঁকিটিকে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে, যেখানে আলোচনার মূল বিষয় ছিল—কীভাবে কূটনৈতিকভাবে সংকট মোকাবিলা করা যায় এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি রাখা যায়। ইউরোপের নেতারা প্রাথমিকভাবে আলোচনার পথকেই অগ্রাধিকার দিতে চান। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ডেনমার্কের শীর্ষ নেতাদের আসন্ন বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইউরোপ আশা করছে, এই বৈঠকের মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে।

তবে আলোচনার পাশাপাশি সামরিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াদেফুল জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ বা দখলের চেষ্টা করে, তাহলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। এর অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে প্রতিরোধের বার্তা দেবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে যে বিষয়টি ইউরোপকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করেছে, তা হলো তাঁর আক্রমণাত্মক কৌশলের পূর্বাভাস। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের উদাহরণ টেনে ওয়াশিংটন ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে, প্রয়োজনে তারা একতরফা কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হয় না। পলিটিকোর বরাতে এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেছেন, ইউরোপ এখন বুঝতে পারছে ট্রাম্পের হুমকি কেবল কথার কথা নয়। তাই সম্ভাব্য সরাসরি সংঘর্ষের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ঐক্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। ট্রাম্পের হুমকির পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশসহ আরও ছয়টি ইউরোপীয় দেশ ডেনমার্কের পক্ষে সমর্থনসূচক বিবৃতি দিয়েছে। তবে এই সমর্থনের ভাষা ও মাত্রা নিয়ে নেতাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। আবার অন্যরা বলছেন, স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান না নিলে যুক্তরাষ্ট্র এটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখবে।

গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অবস্থানও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দ্বীপটির রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যেতে চায় না। তাদের বক্তব্য, তারা আমেরিকান বা ডেনিশ হতে চায় না; তারা নিজেদের পরিচয়েই থাকতে চায়—গ্রিনল্যান্ডবাসী হিসেবে। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের পাঁচটি দলের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র গ্রিনল্যান্ডবাসীদেরই।

ইউরোপের নীতিনির্ধারকেরা উপলব্ধি করছেন, কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক অবস্থান যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তাও জরুরি। এ কারণেই ব্রাসেলস ও কোপেনহেগেন গ্রিনল্যান্ডের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকছে। ধারণা করা হচ্ছে, একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্যাকেজ গ্রিনল্যান্ডবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। ইতোমধ্যে ইইউ বাজেট পরিকল্পনার খসড়ায় ২০২৮ সাল থেকে সাত বছরে গ্রিনল্যান্ডে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ করে ৫৩০ মিলিয়ন ইউরো করার প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের যুক্তির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চীন ও রাশিয়ার প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এই দুই শক্তি গ্রিনল্যান্ডে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্রের পিটুফিক ঘাঁটিতে শতাধিক মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে আরও সেনা মোতায়েন করতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ব্যবস্থা তাঁর কাছে যথেষ্ট নয়; তিনি সরাসরি মালিকানার প্রশ্ন তুলেছেন।

সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের এক নতুন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ এখনো সংঘাত এড়াতে চায়, তবে তারা এটাও স্পষ্ট করতে চাইছে যে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করা হবে না। আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তুতির পাশাপাশি, সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই এখন ইউরোপের কৌশল। এই সংকট শেষ পর্যন্ত কোন পথে গড়ায়, তা নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইউরোপীয় ঐক্যের বাস্তব রূপের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত