প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) দলের সভাপতি এবং হায়দরাবাদের প্রভাবশালী রাজনীতিক আসাদউদ্দিন ওয়াইসি শুক্রবার মহারাষ্ট্রের সোলাপুরে এক নির্বাচনী সমাবেশে মন্তব্য করে বলেছেন, হিজাব পরা একজন নারী একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তিনি এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারতের সংবিধান ও দেশের রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের প্রতি তার দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেছেন। ওয়াইসি বলেন, ভারতের সংবিধান সকল সম্প্রদায়ের নাগরিককে সমান মর্যাদা দেয় এবং কোনো ধর্ম বা লিঙ্গ একজন নাগরিককে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
ওয়াইসির মন্তব্যে সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দলটির কর্মকর্তারা তার বক্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, ওয়াইসি অর্ধসত্য উপস্থাপন করছেন কারণ ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু নারী হিজাব পরার বিরোধী। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এ ধরনের উচ্ছ্বাসমূলক মন্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। তবে ওয়াইসি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “ভারতের সংবিধান যেকোনো নাগরিককে প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এমনকি মেয়র হতে পারার ক্ষমতা দিয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধান যেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নাগরিককেই দেশের সর্বোচ্চ পদে বসার সুযোগ দেয়, সেখানে ভারতের সংবিধান ধর্ম, লিঙ্গ, জাতি নির্বিশেষে সবাইকে সুযোগ দেয়।”
ওয়াইসি আরও বলেন, “সর্বশক্তিমানের রহমতে এমন দিন আসবে, যখন আমি বা আমাদের বর্তমান প্রজন্ম কেউ থাকব না, কিন্তু হিজাব পরা একজন নারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমি নিশ্চিত সেই দিন আসবেই। ভারতবর্ষের জনগণ ধারাবাহিকভাবে উদার ও সমানাধিকারের পথে চলতে থাকবে, আর ঘৃণার রাজনীতির প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে না।”
এআইএমআইএম নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সংবিধান ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সমালোচনামূলক এবং চিন্তাশীল মন্তব্য দিয়ে আসছেন। তার এ বক্তব্যও সেই ধারারই অংশ, যা ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে সমর্থন করে। ওয়াইসি উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে সংবিধানিক অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
ওয়াইসির এই মন্তব্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক মূলনীতি এবং সংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার একটি প্রচেষ্টা। হিজাব পরা নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনার উদাহরণ তুলে দিয়ে তিনি সমানাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকারকে সামনে এনেছেন।
এআইএমআইএম প্রধানের বক্তব্য সামাজিক মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছে। সমর্থকরা ওয়াইসির বক্তব্যকে উদার ও প্রগতিশীল বলে অভিহিত করেছেন, যারা মনে করেন, এ ধরনের বক্তব্য দেশের সংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাবকে প্রতিফলিত করে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, এমন মন্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এছাড়া ওয়াইসি নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে বিজেপির নীতি ও সংখ্যালঘুদের উপর তাদের আচরণকে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “আপনারা (বিজেপি) মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, তা বেশিদিন টিকবে না। ভারতের সংবিধান শক্তিশালী এবং এটি প্রতিটি নাগরিককে সমান অধিকার দেয়।” তার মন্তব্যে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ দিক যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, সমানাধিকার এবং নারী ক্ষমতায়নের কথা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াইসির এ ধরনের বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। সংবিধান ও নাগরিক অধিকারকে কেন্দ্র করে এই ধরনের আলোচনা শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের প্রচারণার অংশ নয়, বরং দেশের জনগণকে তাদের মূল অধিকার ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করার একটি মাধ্যম। তিনি যে ভবিষ্যতে হিজাব পরা নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন, তা প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাকে প্রতিফলিত করে।
ওয়াইসির বক্তব্য ভারতীয় গণতন্ত্রের বৈচিত্র্য এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নের একটি প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সুযোগ দেয়, এবং কোনো ধর্ম, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান কেউকে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। তার মতে, এমন পরিস্থিতি অবশ্যই আসবে যখন একজন হিজাব পরা নারী দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসবেন, যা ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তি ও উদার মূল্যবোধের প্রমাণ হবে।
এমন মন্তব্য রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের সৃষ্টি করলেও ওয়াইসি এই ধরনের বক্তব্যকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যতের উদার চিন্তাভাবনা প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। তার লক্ষ্য হলো সমাজে সংখ্যালঘু ও নারী ক্ষমতায়ন, এবং সংবিধানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে নাগরিক অধিকারকে নিশ্চিত করা।