এআই: মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সভ্যতার সহযাত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬২ বার
এআই: মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সভ্যতার সহযাত্রী

প্রকাশ: ১১  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত চিন্তা ও প্রযুক্তির ইতিহাস। আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে চাকা, বিদ্যুৎ কিংবা ইন্টারনেট—প্রতিটি যুগে নতুন প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। কেউ একে মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন—এটি মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী সহায়ক। এই দ্বন্দ্বই আজকের বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে।

সহজ ভাষায় বললে, এআই হলো মানুষের তৈরি এমন এক বুদ্ধিমান সফটওয়্যার বা যন্ত্র, যা নিজে নিজে শিখতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে এবং মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে। মানুষের মস্তিষ্ক যেমন অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, তেমনি এআই শেখে বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা থেকে। ছবি চিনতে পারা, ভাষা বোঝা, লেখালেখি করা কিংবা সঙ্গীত তৈরি—সবই আজ এআই-এর সক্ষমতার মধ্যে পড়ে। তাই অনেকেই একে ‘কৃত্রিম মস্তিষ্ক’ নামে ডাকছেন।

এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণা একদিনে আসেনি। ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং প্রথম প্রশ্ন তুলেছিলেন—“যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?” তখন এটি নিছক দর্শনভিত্তিক প্রশ্ন মনে হলেও, সেই প্রশ্নই আজকের এআই বিপ্লবের বীজ রোপণ করে। এরপর ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজে এক সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় এআই-এর দীর্ঘ গবেষণাযাত্রা।

প্রথম যুগের এআই ছিল খুবই সাধারণ। নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের ভিত্তিতে ‘যদি-তবে’ শর্ত মেনে কাজ করত এসব প্রোগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল কাজ করাতে হলে যন্ত্রকেও শিখতে দিতে হবে। ফলে জন্ম নেয় ‘মেশিন লার্নিং’। আরও পরে আসে ‘ডিপ লার্নিং’, যেখানে নিউরাল নেটওয়ার্ক মানুষের মস্তিষ্কের আদলে কাজ করতে শুরু করে। ২০১২ সালে ‘অ্যালেক্সনেট’ নামের একটি মডেলের সাফল্যের মধ্য দিয়ে এআই গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা হয়, যার ধারাবাহিকতায় আজ আমরা চ্যাটজিপিটি, জেমিনি কিংবা মিডজার্নির মতো শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম দেখতে পাচ্ছি।

বাস্তবে আসার অনেক আগেই এআই মানুষের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছিল। মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ উপন্যাস কিংবা কারেল চ্যাপেকের নাটকে মানুষের তৈরি বুদ্ধিমান সত্তার যে ভয় ও আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। আধুনিক চলচ্চিত্রেও এআই কখনো মানবতার রক্ষক, কখনো আবার ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়েছে। এসব গল্প আসলে মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্বকেই প্রকাশ করে—প্রযুক্তি কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব?

বর্তমান বাস্তবতায় এআই মানুষের জীবনে এক অভাবনীয় গতি এনেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এখন জটিল বিষয় সহজভাবে বুঝতে পারছে, গবেষণায় সময় বাঁচছে বহুগুণ। চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই রোগ শনাক্তকরণ, স্ক্যান বিশ্লেষণ এবং জটিল অস্ত্রোপচারে সহায়ক হয়ে উঠেছে। কৃষিক্ষেত্রে শস্যের রোগ নির্ণয়, সেচ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় এআই কৃষকদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে। এমনকি শিল্প ও সৃজনশীল ক্ষেত্রেও এআই আজ মানুষের কল্পনাকে দৃশ্যমান করে তুলছে।

এই দিক থেকে দেখলে এআই মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শক্তিশালী সহায়ক। অনেক বিশেষজ্ঞ একে মানুষের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলে আখ্যা দেন। কারণ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এআই মানুষের চিন্তার পরিসরকে বাড়িয়ে দেয়, সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেয়।

তবে আশঙ্কার জায়গাটিও ছোট নয়। সবচেয়ে বড় ভয় হলো—এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, সাংবাদিকতা, এমনকি সফটওয়্যার উন্নয়নেও এআই দ্রুত কাজ করতে পারছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে মানুষের প্রয়োজন কমে যাবে। যদিও বিশ্লেষকরা বলেন, এআই নতুন ধরনের কাজও সৃষ্টি করবে, যেখানে মানবিক বিচারবোধ ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন থাকবে।

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো তথ্যনিরাপত্তা ও নৈতিকতা। ভুয়া ছবি, মিথ্যা খবর কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরিতে এআই-এর অপব্যবহার ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই কারণেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এআই ব্যবহারে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ইউনেস্কো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা নিয়ে সুপারিশ দিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও এআই নিয়ন্ত্রণে আইন তৈরির পথে এগোচ্ছে।

মানসিক ও সামাজিক দিক থেকেও এআই নতুন প্রশ্ন তুলছে। অনেক মানুষ এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ চ্যাটবটের সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যা মনোবিজ্ঞানীদের মতে ‘ডিজিটাল নিঃসঙ্গতা’ বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা মানুষের সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবু মানুষের সঙ্গে এআই-এর মৌলিক পার্থক্য এখনো স্পষ্ট। মানুষ অনুভূতি অনুভব করে, ভালোবাসে, কষ্ট পায়, স্বপ্ন দেখে। মানুষের শিল্প, সাহিত্য ও আবিষ্কারের পেছনে থাকে আবেগ ও অভিজ্ঞতার গভীরতা, যা এআই কেবল অনুকরণ করতে পারে, অনুভব করতে পারে না। এই জায়গাটিই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

সবশেষে প্রশ্নটি দাঁড়ায়—এআই কি মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী? বাস্তবতা হলো, এআই প্রতিদ্বন্দ্বী তখনই হবে, যখন মানুষ নিজের মানবিক বৈশিষ্ট্য ভুলে যাবে। কিন্তু যদি মানুষ নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও আবেগকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে, তাহলে এআই হবে সভ্যতার এক অনন্য সহযাত্রী। প্রযুক্তি হয়তো নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু মানুষ তার অনুভূতি ও চিন্তার গভীরতায় এখনো অনন্য—আর সেই অনন্যতাই ভবিষ্যতের দিশা দেখাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত