প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দেশজুড়ে টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে সরকার ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার সরাসরি মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এই ঘোষণা ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের ‘অর্জনসমূহ’ রক্ষায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, টানা দুই রাত ধরে ‘সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠী’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করেছে এবং সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্যদের হত্যা করেছে। এই প্রেক্ষাপটে আইআরজিসির মতে, পরিস্থিতি আর শুধু আইনশৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দেশটির সেনাবাহিনী থেকে আলাদা একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বাহিনী, যা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে পরিচালিত হয়। শুধু সামরিক শক্তিই নয়, অর্থনীতি, রাজনীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তেও এই বাহিনীর বড় প্রভাব রয়েছে। অতীতে যেকোনো বড় অভ্যন্তরীণ সংকটে আইআরজিসির সক্রিয় ভূমিকা দেশটির ইতিহাসে নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ব্যাপকতা ও সহিংসতার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে তাদের সরাসরি মাঠে নামার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আইআরজিসির ঘোষণার পাশাপাশি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা দেশের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনসম্পত্তি রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, যেকোনো বিশৃঙ্খলা কঠোরভাবে দমন করা হবে। আইআরজিসি ও সেনাবাহিনী—উভয়ই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অধীন থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে।
এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকে। ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের চাপে রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে এই আন্দোলন ছিল অর্থনৈতিক দাবিকেন্দ্রিক। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। এখন অনেক বিক্ষোভকারী প্রকাশ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তুলছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার রাতেও তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারাজে একটি পৌরসভা ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন শহরে সরকারি দপ্তর, ব্যাংক ও নিরাপত্তা বাহিনীর যানবাহনে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকার এসব ঘটনাকে ‘সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করলেও আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে হতাহতের সংখ্যাকে ঘিরে। তেহরানের চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালে অন্তত ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ ছিলেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় উপচে পড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও সরকারিভাবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিক্ষোভ দমনে সরকারের আরেকটি বড় পদক্ষেপ হলো ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া। একটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানে টানা ৩৬ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নেটব্লকস জানিয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন, যা তথ্য আদান-প্রদান ও সংবাদ প্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অতীতে বিক্ষোভের সময় ইরান সরকার ইন্টারনেট বন্ধের কৌশল ব্যবহার করেছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া পড়ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনে ইরানের দূতাবাসের সামনে শনিবার কয়েক শ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ইরানের পতাকা হাতে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। একপর্যায়ে একজন বিক্ষোভকারী দূতাবাস ভবনের বারান্দায় উঠে পড়েন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে।
লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজনকে গুরুতর অনধিকার প্রবেশ ও জরুরি কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগে এবং অন্যজনকে গুরুতর অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে আটক করা হয়। পুলিশ আরও জানায়, দূতাবাস এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবাদ চললেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি দূতাবাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইরানের পতাকা নামিয়ে ফেলছেন। পরে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ আবার পতাকা উত্তোলন করে এবং সেটির ছবি নিজেদের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে। এই ঘটনাও প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে ক্ষোভ ও আবেগকে আরও উসকে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানে চলমান এই বিক্ষোভ শুধু সাময়িক অস্থিরতা নয়, বরং এটি দেশটির শাসনব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন। আইআরজিসির মাঠে নামার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আপাতত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আরও সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ জোরালো হলে ইরানের ওপর নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরান এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রাষ্ট্রের কঠোর নিরাপত্তা নীতি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ—এই দুইয়ের সংঘর্ষ দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এটুকু স্পষ্ট, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মাঠে নামার ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইরানের বর্তমান সংকট আরও গভীর ও স্পর্শকাতর পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।