প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও ক্রমাবনত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সরকার দেশটিতে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের জরুরি ভিত্তিতে ইরান ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তর (ডিএফএটি) হালনাগাদ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি দ্রুত এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন দেশ ছাড়ার সব ধরনের বাণিজ্যিক সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য ইরান ত্যাগ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠবে।
ডিএফএটির প্রকাশিত সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বর্তমানে সীমিত আকারে হলেও বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু রয়েছে এবং স্থলপথে প্রতিবেশী দেশে যাওয়ার কিছু সুযোগ এখনো বিদ্যমান। তবে এই পরিস্থিতি যে কোনো মুহূর্তে পরিবর্তিত হতে পারে। আকাশসীমা বন্ধ, হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল কিংবা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ উপায়ে ইরান ত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের সতর্কতায় আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সরকারি পরামর্শ উপেক্ষা করে কেউ যদি ইরানে অবস্থান চালিয়ে যান, তাহলে নিজের নিরাপত্তার দায়ভার সম্পূর্ণভাবে তাকেই নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘরের ভেতর বা নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করতে হতে পারে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে পর্যাপ্ত পানি, খাদ্যদ্রব্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ইরানে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে, কোথাও কোথাও ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করা হয়েছে এবং চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এসব ঘটনার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের বিস্তার ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। সরকারি ভবন, কূটনৈতিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে হঠাৎ অভিযান, রাস্তা বন্ধ কিংবা কারফিউয়ের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব কারণেই অস্ট্রেলিয়া সরকার আগাম সতর্কতা জারি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ সতর্কতা নয়, বরং নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষায় একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো দেশে হঠাৎ করে পরিস্থিতির অবনতি হলে বিদেশিদের সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিমানবন্দর বন্ধ, ফ্লাইট সংকট এবং কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তখন নাগরিকরা কার্যত আটকে পড়েন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আগেভাগে দেশত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। ইরানে অবস্থানরত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের মধ্যে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, গবেষক এবং দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তিরাও রয়েছেন। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পরিবার থেকে দূরে থাকা এসব মানুষের জন্য মানসিক চাপ ও উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, তারা তেহরানে অবস্থিত তাদের কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে।
এদিকে শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, বিভিন্ন পশ্চিমা দেশও ইরান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি বা হালনাগাদ করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সতর্কতা কোনো দেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও নাগরিক সুরক্ষার প্রশ্নে সরকারগুলো কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়।
ইরান সরকার অবশ্য বরাবরের মতোই দাবি করছে, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম। তবে বাস্তব চিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তারা বলছেন, বিক্ষোভের মূল কারণগুলো এখনো সমাধান হয়নি এবং এর ফলে পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল থাকতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে বিদেশি নাগরিকদের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
অস্ট্রেলিয়ার ডিএফএটি তাদের সতর্কবার্তায় নাগরিকদের আরও পরামর্শ দিয়েছে যে, ইরানে অবস্থানরতরা যেন নিয়মিত সরকারি ঘোষণা ও ভ্রমণ সতর্কতা পর্যবেক্ষণ করেন এবং জরুরি প্রয়োজনে অস্ট্রেলীয় কনস্যুলার সহায়তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা অসমর্থিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই খবরটি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের বড় একটি অংশ কাজ করেন বা বসবাস করেন। ইরানের পরিস্থিতি যদি আরও জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি প্রবাসী নিরাপত্তা ইস্যুতে বিভিন্ন দেশ কীভাবে আগাম পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষণীয় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের দেশ ছাড়ার আহ্বান একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। এই সতর্কতা শুধু অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও ইরানের বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।