প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাও যে বিবেচনায় রয়েছে, তা স্পষ্ট করে বলেছেন তিনি। রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, ইরান পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুবই গুরুত্বের সঙ্গে’ পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিষয়টি সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছি। সামরিক বাহিনী বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আমরা খুব শক্তিশালী বিকল্পের কথা ভাবছি। আমরা একটি সিদ্ধান্ত নেব।” তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কূটনৈতিক পথের পাশাপাশি সামরিক পদক্ষেপও যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় রয়েছে। এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানে চলমান বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাব্য হুমকির পর ইরানের নেতৃত্ব আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছে এবং একটি বৈঠকের আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন যে, আলোচনার আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা যেকোনো সময় নতুন সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের এই সর্বশেষ হুঁশিয়ারি এমন এক প্রেক্ষাপটে এলো, যখন ইরানের শীর্ষ নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছেন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “ইরানের ওপর কোনো ধরনের আক্রমণ হলে দখলকৃত অঞ্চল তথা ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত সব মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।” তার এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা ইরানি রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে দোকান বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রথমে এই বিক্ষোভ অর্থনৈতিক দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে খুব দ্রুত তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ১০৯ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে, দেশের বাইরে অবস্থানরত বিরোধী গোষ্ঠী ও মানবাধিকারকর্মীরা দাবি করছেন, নিহতের সংখ্যা সরকার ঘোষিত হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি এবং এতে শত শত বিক্ষোভকারীও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পরিস্থিতির জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাবকে প্রভাবিত করছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে আলোচনায় বসাতে চায়, অন্যদিকে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে শক্ত অবস্থান দেখাতে চাইছে। তবে সামরিক পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের। বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানি রিয়ালের অবমূল্যায়নের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক সংঘাত শুরু হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণে বাড়বে বলে মনে করছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
আন্তর্জাতিক মহলেও ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ইউরোপীয় কূটনীতিকরা সংযমের আহ্বান জানাচ্ছেন এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ সংকুচিত করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান তার সমর্থকদের মধ্যে শক্ত বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত হলে তা ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান আগেই জানিয়েছে, আক্রমণের জবাবে তারা শুধু নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারে। এতে করে একটি আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। ইরানের ভেতরে যেমন আতঙ্ক বাড়ছে, তেমনি প্রবাসী ইরানি ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি বা হালনাগাদ করেছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত সংঘাত ঠেকাতে পারবে নাকি সামরিক সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হবে—সেই দিকেই এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ব। পরিস্থিতি যে কোনো সময় নাটকীয় মোড় নিতে পারে, আর তার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।