জাতিসংঘের আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৩ বার
রোহিঙ্গা গণহত্যা আইসিজে বিচার

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে দেশটির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) যুগান্তকারী মামলার বিচার কাজ আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শুরু হওয়া শুনানি চলবে তিন সপ্তাহ ধরে। যদিও মিয়ানমার অভিযোগ অস্বীকার করেছে, এই মামলার ফলাফল শুধু দেশটিতে নয়, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করবে।

আইসিজেতে এটি প্রথম গণহত্যা মামলা, যার পূর্ণাঙ্গ শুনানি সম্পন্ন হবে। সংবেদনশীলতার কারণে জনসাধারণ এবং গণমাধ্যমের জন্য hearing বন্ধ থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই মামলা গণহত্যার সংজ্ঞা, প্রমাণীকরণ প্রক্রিয়া এবং লঙ্ঘনের প্রতিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। মিয়ানমারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী অন্যান্য গণহত্যার অভিযোগ, যেমন গাজা যুদ্ধের ঘটনায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলা, এই মামলার প্রভাব হতে পারে।

২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশ গাম্বিয়া আইসিজেতে মামলা দায়ের করে। মামলায় অভিযোগ আনা হয়, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। ওই অভিযানে কমপক্ষে সাত লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যাটি প্রায় ১০ লাখ। রোহিঙ্গারা তখন থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন এবং এখনও এখানে বসবাস করছেন।

২০১৭ সালের সেনা অভিযান পরপরই জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী দল রোহিঙ্গা সংকটের তদন্ত করে। তদন্ত প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘গণহত্যামূলক তৎপরতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই গাম্বিয়া ২০১৯ সালে আইসিজেতে মামলা দায়ের করে। এভাবেই আজকের শুনানি শুরু হচ্ছে।

মিয়ানমারের তখনকার প্রধানমন্ত্রী অং সান সুচি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গাম্বিয়া মামলা দায়ের করলে সুচি এটিকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এরপর ২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের ফলে সুচি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। সেনাবাহিনীর আদালতে দুর্নীতির অভিযোগে তার বিচার চলছে।

আইসিজে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার গুরুত্ব শুধু বিচারের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা, সংখ্যালঘু অধিকার, এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মামলার মাধ্যমে গণহত্যা সংজ্ঞা এবং প্রমাণীকরণের নতুন মানদণ্ড স্থাপিত হবে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য সংঘবদ্ধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে।

জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত সংস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান রয়টার্সকে বলেছেন, এই মামলাটি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার প্রমাণ, সংজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। মামলার সঠিক শোনানি এবং বিচারের মাধ্যমে শুধু মিয়ানমারের অপরাধীদের বিচার হবে না, বরং বিশ্ব মানবাধিকার রক্ষা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এটি সহায়ক হবে।

২০১৭ সালের অভিযানে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মতো ভয়াবহ ঘটনা সংঘটিত হয়। এই ঘটনার কারণে লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে আসে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর তখন থেকেই এই সংকটের প্রতি নিবদ্ধ ছিল। আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলা দিয়েই এই ঘটনার ন্যায়পরায়ণ বিচার নিশ্চিত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আইসিজেতে শুরু হওয়া শুনানি তিন সপ্তাহ ধরে চলবে। এতে রোহিঙ্গা গণহত্যার সমস্ত প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং মিয়ানমারের পক্ষের যুক্তি বিবেচনা করা হবে। বিচার প্রক্রিয়া শেষে আদালত রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ভার নির্ধারণের জন্য চূড়ান্ত রায় প্রদান করবে। এই রায় শুধু মিয়ানমারের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

এই মামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত হবে। এছাড়া অন্যান্য দেশের গণহত্যা মামলা, যেমন গাজা ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিষয়ক মামলা, আইসিজেতে প্রভাবিত হবে। ফলে, এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত