প্রকাশ:১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে যোগাযোগকে আমরা যেভাবে সহজ, দ্রুত এবং স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, তার পেছনে রয়েছে অসংখ্য ব্যর্থতা, অপেক্ষা ও অদম্য বিশ্বাসের গল্প। আজ হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া দৈনন্দিন জীবন কল্পনাই করা যায় না—পারিবারিক আলাপ, অফিসের কাজ, ব্যবসা, এমনকি জরুরি তথ্য আদান-প্রদানেও এই অ্যাপটি যেন অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কিন্তু এই বৈশ্বিক যোগাযোগমাধ্যমের যাত্রা শুরু হয়েছিল খুবই সাধারণ একটি ভাবনা থেকে, যা তখনকার দিনে কেউই কল্পনা করতে পারেননি এত বড় রূপ নেবে।
সময়টা ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি। ইন্টারনেট দুনিয়ায় তখন ফেসবুক ও টুইটারের উত্থান চলছে, স্মার্টফোনের বাজার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ঠিক সেই সময় ইয়াহুর দুই প্রাক্তন কর্মী জান কৌম ও ব্রায়ান অ্যাক্টন নতুন কিছু করার স্বপ্নে বিভোর। ইয়াহুতে দীর্ঘদিন কাজ করেও তারা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত সৃজনশীলতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। জান কৌম সদ্য একটি আইফোন কিনেছেন। অ্যাপ স্টোর ঘাঁটতে ঘাঁটতে তার মাথায় আসে একটি সাধারণ কিন্তু অভিনব ধারণা—এমন একটি অ্যাপ, যেখানে মানুষ নিজের বর্তমান অবস্থা বা স্ট্যাটাস জানাতে পারবে। তখনো এই ভাবনায় কোনো মেসেজিং সুবিধা যুক্ত ছিল না।
এই ধারণা নিয়ে আলোচনা চলত ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চিম সান হোসেতে কৌমের রুশ বন্ধু অ্যালেক্স ফিশম্যানের বাড়িতে। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বোনা হতো। দ্রুতই তারা বুঝতে পারেন, শুধু ভাবনা থাকলেই হবে না—এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একজন দক্ষ আইফোন ডেভেলপার। ফিশম্যান RentACoder.com-এ খোঁজ চালিয়ে রাশিয়ান প্রোগ্রামার ইগর সোলোমেনিকভকে খুঁজে পান। তার হাত ধরেই শুরু হয় হোয়াটসঅ্যাপের প্রযুক্তিগত যাত্রা।
অ্যাপটির নামকরণেও ছিল হালকা রসিকতা। ইংরেজি অভিবাদন ‘What’s Up’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নাম রাখা হয় ‘WhatsApp’। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত হয় WhatsApp Inc.। তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম দিকের ভার্সনগুলো বারবার ক্র্যাশ করত, ব্যবহারকারীরা হতাশ হয়ে পড়তেন। জান কৌম নিজেও একপর্যায়ে প্রায় হাল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেই সংকটময় সময়ে ব্রায়ান অ্যাক্টন তাকে বলেছিলেন, “আর কয়েক মাস অপেক্ষা করো।” এই এক বাক্যই হয়তো ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
২০০৯ সালের জুন মাসে অ্যাপল চালু করে পুশ নোটিফিকেশন। এই প্রযুক্তিই হোয়াটসঅ্যাপের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়। জান কৌম দ্রুত অ্যাপটি আপডেট করেন, যাতে কেউ স্ট্যাটাস পরিবর্তন করলে তা সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের কাছে পৌঁছে যায়। ব্যবহারকারীরা বুঝতে শুরু করেন, এটি শুধু স্ট্যাটাস জানানোর মাধ্যম নয়, বরং এক ধরনের তাৎক্ষণিক যোগাযোগের পথ।
একই বছরের আগস্টে আসে WhatsApp 2.0। এবার যুক্ত হয় পুরোপুরি মেসেজিং সুবিধা। ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় আড়াই লাখে। অক্টোবরে ব্রায়ান অ্যাক্টন আনুষ্ঠানিকভাবে সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যোগ দেন এবং ইয়াহুর সাবেক সহকর্মীদের কাছ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের প্রাথমিক তহবিল সংগ্রহ করেন। এই অর্থই হোয়াটসঅ্যাপকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
এরপর দ্রুতগতিতে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে হোয়াটসঅ্যাপ। আইফোনের পাশাপাশি ব্ল্যাকবেরি, সিম্বিয়ান এবং অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরাও যুক্ত হতে থাকেন। শুরুতে অ্যাপটি বিনামূল্যে ব্যবহার করা যেত। তবে যাচাইকরণ এসএমএস পাঠানোর খরচ সামলাতে একসময় নামমাত্র ফি চালু করা হয়। তবুও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে। ২০১১ সালের মধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ স্টোরের শীর্ষ ২০ অ্যাপের একটি হয়ে ওঠে।
এই সাফল্য বিনিয়োগকারীদের নজর এড়ায়নি। ২০১১ সালে সেকোইয়া ক্যাপিটাল প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে হোয়াটসঅ্যাপে। এটি ছিল কোম্পানিটির জন্য একটি বড় মাইলফলক। ২০১৩ সালের মধ্যে সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ২০০ মিলিয়ন। প্রযুক্তি বিশ্বে তখন হোয়াটসঅ্যাপকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
এরপর আসে ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে ফেসবুক ঘোষণা দেয়, তারা ১৯ বিলিয়ন ডলারে হোয়াটসঅ্যাপ কিনে নিচ্ছে। প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই খবর ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কেউ এটিকে দূরদর্শী বিনিয়োগ বলে প্রশংসা করলেন, আবার কেউ ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। অধিগ্রহণের পরপরই টেলিগ্রামসহ অন্যান্য মেসেজিং অ্যাপে ব্যবহারকারীর ঢল নামে।
ফেসবুকের অধীনে থেকেও হোয়াটসঅ্যাপ ধীরে ধীরে নিজস্ব দর্শন ধরে রাখার চেষ্টা করে। ভয়েস কল, ভিডিও কল, স্ট্যাটাস, এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন, ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট—একটির পর একটি নতুন ফিচার যুক্ত হয়। ২০১৬ সালে বার্ষিক ১ ডলারের সাবস্ক্রিপশন ফি তুলে নেওয়া হয়। জান কৌম স্পষ্ট করে ঘোষণা দেন, হোয়াটসঅ্যাপে কোনো বিজ্ঞাপন থাকবে না; ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাই থাকবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কও আসে। ডেটা শেয়ারিং ও গোপনীয়তা নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, ইউরোপীয় কমিশন জরিমানা আরোপ করে। ২০১৭ সালে ব্রায়ান অ্যাক্টন কোম্পানি ছেড়ে সিগন্যাল ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। ২০১৮ সালে বিদায় নেন জান কৌমও। প্রতিষ্ঠাতারা চলে গেলেও হোয়াটসঅ্যাপ থেমে থাকেনি।
২০২০ সালের পর করোনাভাইরাস মহামারির সময় হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে ওঠে তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। স্বাস্থ্যবিধি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই অ্যাপটির ব্যবহার বেড়ে যায় বহুগুণ। ডার্ক মোড, মাল্টি-ডিভাইস সাপোর্ট, কমিউনিটি ফিচার, বড় ফাইল শেয়ারিংয়ের সুবিধা যুক্ত হয়ে হোয়াটসঅ্যাপ আরও শক্তিশালী রূপ নেয়। ২০২২ সালে গ্রুপের সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১২ জনে, ফাইল পাঠানোর সীমা হয় ২ গিগাবাইট।
একসময় যে অ্যাপটি ছিল নিছক একটি স্ট্যাটাস জানানোর প্ল্যাটফর্ম, আজ তা এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। হোয়াটসঅ্যাপের জন্মকথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাধারণ একটি ভাবনাও, যদি তাতে বিশ্বাস ও ধৈর্য থাকে, তবে তা বদলে দিতে পারে গোটা বিশ্বের যোগাযোগের ধরণ।