প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের নারী ফুটবল লিগে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় গোলের সংখ্যা। ২৩-০, ১৮-০ কিংবা ১৫-০—এই স্কোরলাইনগুলো যেন নিয়মিত চিত্র হয়ে উঠেছে চলমান লিগে। চার রাউন্ড শেষে ২০টি ম্যাচে মোট গোল হয়েছে ১৫৭টি, যা গড়ে প্রতিটি ম্যাচে প্রায় আটটিরও বেশি গোলের হিসাব দাঁড় করায়। একদিকে এই গোলবন্যা দর্শকদের চোখ কাড়লেও, অন্যদিকে লিগের প্রতিযোগিতামূলক মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
ফিফা ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) শর্ত পূরণ করতে ১১টি ক্লাব নিয়ে শুরু হয়েছে এবারের নারী ফুটবল লিগ। মূল লক্ষ্য এএফসি উইমেন্স চ্যাম্পিয়নস লিগ ও সাফ ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি দলকে কমপক্ষে ১০টি ম্যাচ খেলতে হবে। কাগজে-কলমে এই আয়োজন আন্তর্জাতিক মান পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও মাঠের খেলায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা। চারটি শক্তিশালী দলের বাইরে বাকি দলগুলো প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই বড় ব্যবধানে হেরে যাচ্ছে।
ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একের পর এক ম্যাচ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের চিত্র তুলে ধরতে পারছে না। জাতীয় দলের কোচ পিটার বাটলারও নিয়মিত এই ম্যাচগুলো দেখছেন, কিন্তু মানহীন খেলা দেখে তার অসন্তোষ স্পষ্ট। মাঠে খেলোয়াড়দের চেষ্টা থাকলেও দলগত শক্তি ও অভিজ্ঞতার বিশাল ব্যবধানের কারণে ম্যাচগুলো অনেক সময় একপেশে হয়ে পড়ছে।
গোলের বন্যার পরিসংখ্যানই এই ব্যবধানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইতোমধ্যে লিগে তিনটি ডাবল হ্যাটট্রিক এবং ১৩টি হ্যাটট্রিক হয়েছে। ফরাশগঞ্জের শামসুন্নাহার জুনিয়র ও মারিয়া মান্দা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উন্নতি খাতুন ডাবল হ্যাটট্রিক করে আলোচনায় এসেছেন। প্রথম রাউন্ড থেকেই গোলের বৃষ্টি শুরু হলেও চতুর্থ রাউন্ডে এসে যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একদিনে অনুষ্ঠিত পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে চারটিতেই একাধিক হ্যাটট্রিক হয়েছে, যা লিগের ইতিহাসে বিরল হলেও প্রতিযোগিতার মান নিয়ে প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
চতুর্থ রাউন্ডের ম্যাচগুলো ছিল গোলবন্যার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন নাসরিন স্পোর্টস একাডেমির বিপক্ষে আনসার ও ভিডিপির উমেহলা মারমা একাই পাঁচ গোল করেছেন। ঢাকা রেঞ্জার্সের বিপক্ষে পুস্করনীর জান্নাতুল চার গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন। সিরাজ স্মৃতি সংসদের বিপক্ষে ফরাশগঞ্জের ৯-০ ব্যবধানে জয়ও লিগের একপেশে চিত্র স্পষ্ট করেছে। সেই ম্যাচে শামসুন্নাহার জুনিয়র করেছেন চার গোল এবং মারিয়া মান্দা করেছেন তিনটি।
এই গোলবন্যা নতুন নয়, তবে এবারের লিগে এর মাত্রা অভাবনীয়। নারী ফুটবলের উন্নয়নে নিয়মিত লিগ আয়োজন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু যখন একই লিগে একদিকে ২০টির বেশি গোলের জয়, অন্যদিকে বড় ব্যবধানের হার নিয়মে পরিণত হয়, তখন উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক লিগ না হলে খেলোয়াড়দের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়, বিশেষ করে যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
ভুটান নারী লিগে বাংলাদেশের ফুটবলারদের অংশগ্রহণ নিয়েও এর আগে আলোচনা হয়েছিল। ভুটানে গিয়ে বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা অনেক গোল করায় সেই লিগের মান নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন জাতীয় দলের কোচ পিটার বাটলার। তিনি তখন মত দিয়েছিলেন, বিদেশে না গিয়ে খেলোয়াড়দের ঘরের মাঠেই ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত খেলানো উচিত। তার যুক্তি ছিল, দেশীয় লিগ শক্তিশালী হলে জাতীয় দলও উপকৃত হবে। কিন্তু এখন ঘরের মাঠের লিগেই যখন ভুটানের চেয়েও বেশি একপেশে ফল দেখা যাচ্ছে, তখন সেই যুক্তি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
কোচ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ দলগুলোর প্রস্তুতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা। কয়েকটি দল নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পেশাদার কোচিং ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, আর অন্য দলগুলো আর্থিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় পিছিয়ে পড়ছে। ফলে মাঠে নামার আগেই শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর ফল ভোগ করছে পুরো লিগ।
দর্শকদের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে বড় ব্যবধানের জয় কিছুটা উত্তেজনা তৈরি করলেও, নিয়মিত এমন ফলাফল দর্শকদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। কারণ দর্শক চায় টানটান লড়াই, অনিশ্চিত ফল আর শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা। যখন ম্যাচের প্রথমার্ধেই ফল প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন উত্তেজনা ধরে রাখা কঠিন।
তবে ইতিবাচক দিকও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গোলবন্যার মধ্য দিয়ে কিছু খেলোয়াড় নিজেদের গোলস্কোরিং দক্ষতা ও আক্রমণাত্মক সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন। শামসুন্নাহার জুনিয়র, মারিয়া মান্দা, উন্নতি খাতুন কিংবা উমেহলা মারমার মতো ফুটবলাররা নিয়মিত গোল করে আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে জাতীয় দলের জন্য কাজে আসতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে করা এই গোল আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলে কতটা কার্যকর হবে।
নারী ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য লিগের কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন অনেকেই। দলগুলোর মধ্যে শক্তির ভারসাম্য আনা, ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা এবং ক্লাবগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। না হলে লিগ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য—প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য খেলোয়াড় প্রস্তুত করা—সেটি ব্যাহত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নারী ফুটবল লিগে ২০ ম্যাচে ১৫৭ গোল নিঃসন্দেহে একটি চমকপ্রদ পরিসংখ্যান। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রতিযোগিতার ঘাটতি ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বাস্তবতা থেকে কী শিক্ষা নেয় এবং ভবিষ্যতে লিগকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও মানসম্মত করতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কারণ নারী ফুটবলের সম্ভাবনা বিশাল, আর সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে গোলের সংখ্যার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে লিগের প্রকৃত মান ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।