পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই: ইরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ বার
ইরান বিক্ষোভ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে টানা কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভ, সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, চলমান বিক্ষোভকে সহিংস ও রক্তাক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছেন। তবে ইরান সরকার সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে এবং অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল বলে তিনি দাবি করেন।

সোমবার তেহরানে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে আব্বাস আরাঘচি বলেন, গত সপ্তাহান্তে কিছু এলাকায় সহিংসতা বাড়লেও এখন সার্বিক পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার ভাষায়, “ইরান আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রস্তুত ও সচেতন। আমাদের জনগণ জানে, এই বিক্ষোভকে ব্যবহার করে কারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।”

আরাঘচির অভিযোগ অনুযায়ী, ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি বিক্ষোভকারীদের ভেতরে থাকা উগ্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আরও উসকে দিয়েছে। তার দাবি, এসব গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল সহিংসতা বাড়িয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া। তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আবার সংলাপের দরজাও বন্ধ করিনি। কিন্তু ইরানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস হবে না।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সরকার ইতোমধ্যে এমন ভিডিওপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে যেখানে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণের দৃশ্য দেখা গেছে। এই অস্ত্রধারীদের অনেককে আটক করা হয়েছে এবং শিগগিরই তাদের স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি। তার মতে, এসব প্রমাণই দেখায় যে বিক্ষোভ পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না; বরং এর পেছনে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র কাজ করেছে।

বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান আরাঘচি। তিনি বলেন, যারা সহিংসতায় জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, সাধারণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সহিংসতায় জড়িতদের আলাদা করে দেখা হচ্ছে।

দেশজুড়ে চারদিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার বিষয়েও কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় শিগগিরই ইন্টারনেট সংযোগ ধাপে ধাপে পুনঃস্থাপন করা হবে। দূতাবাস, সরকারি দপ্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে ইতোমধ্যে সংযোগ ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প রোববার সাংবাদিকদের জানান, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ‘খুব কঠোর কিছু বিকল্প’ বিবেচনা করছে। তার বক্তব্যে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ট্রাম্প বলেন, “আমরা বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সামরিক বাহিনীও প্রস্তুত রয়েছে। সামনে খুব শক্ত কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে।”

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের জবাবে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নেয়। দেশটির সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ক্বালিবাফ সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইলি হামলা ও ১২ দিনের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সব ঘাঁটি বৈধ হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। তার এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়, ইরান যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপের জবাব দিতে প্রস্তুত।

একই সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ইতিহাসে অহংকারী শাসকদের পরিণতি কখনো ভালো হয়নি। ফিরাউন, নমরুদ কিংবা রেজা শাহর পতনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একই পরিণতি ‘অহঙ্কারী’ ট্রাম্পকেও দেখতে হবে। এই বক্তব্যকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন।

ইরানে টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভে হতাহতের সংখ্যা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন দাবি রয়েছে। সরকার নিহতদের ‘শহিদ’ ঘোষণা করে তিন দিনের জাতীয় শোক পালন করছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১০৯ সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সরকার প্রকাশ করেনি। প্রবাসী ইরানি মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, নিহত বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কয়েকশতে পৌঁছাতে পারে।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বিক্ষোভের প্রকৃত চিত্র বাইরে আসতে দেরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগের তুলনায় ভিডিও ও ছবি অনেক কম দেখা যাচ্ছে। এতে তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। উত্তরে ক্যাসপিয়ান সাগর থেকে দক্ষিণে ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই দেশ হরমুজ প্রণালীর ওপর বড় প্রভাব রাখে, যে প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। ফলে ইরানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

হাজার বছরের ইতিহাস ও সমৃদ্ধ সভ্যতা নিয়ে ইরান বিশ্বের প্রাচীনতম রাষ্ট্রগুলোর একটি। পারসিয়ানদের পাশাপাশি কুর্দি, বালুচ, আজারি ও আরবসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এই দেশকে করেছে বৈচিত্র্যময়। তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান ও তাবরিজের মতো শহরগুলো শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

চলমান বিক্ষোভের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিভিন্ন শহরে বিচ্ছিন্নভাবে ছোট পরিসরের আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। তেহরানের নাভাব ও সাদাত আবাদ এলাকা, চাহারমাহাল ও বাখতিয়ারির জুনকান ও হাফশেজান এবং রাযাভি খোরাসানের তায়াবাদে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনার খবর দিয়েছে ফার্স নিউজ।

সব মিলিয়ে, ইরান সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং কোনো বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। একই সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি তেহরান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বক্তব্য ও পাল্টা হুঁশিয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার বদলে আরও বাড়ার আশঙ্কাই আপাতত বেশি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত