প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিকল্প নেই—এমন স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ও বিশিষ্ট নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীল আচরণের অভাব থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়া বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে বরিশালে আয়োজিত সুজনের একটি বিভাগীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ড. বদিউল আলম। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার বক্তব্যে উঠে আসে গভীর উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা।
ড. বদিউল আলম বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও বাস্তবে এই প্রক্রিয়া বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা সংকট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহিংস রাজনীতির সংস্কৃতি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কার্যত অসম্ভব।
তিনি বলেন, “রাজনীতিবিদরা যদি উত্তেজনা কমান, সহিংসতায় লিপ্ত না হন এবং সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য অপকৌশল ও অনৈতিক পন্থা পরিহার করেন, তাহলে নির্বাচন একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব শর্ত পূরণ না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে।”
ড. বদিউল আলম তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপমা টেনে বলেন, নির্বাচনি ট্রেন বর্তমানে ট্র্যাকে উঠেছে। অর্থাৎ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ট্রেন যে কোনো সময় ট্র্যাকচ্যুত হতে পারে, যদি রাজনীতিবিদ ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা দায়িত্বশীল আচরণ না করেন। তার ভাষায়, “নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা এখনো আছে। এটিকে ট্র্যাকচ্যুত করতে পারেন রাজনীতিবিদ এবং প্রার্থীরাই। তারা যদি সদাচরণ করেন, তাহলে নির্বাচনে বড় কোনো ঝুঁকি থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে জড়িত ভোটারদের আস্থা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন। এই তিনটি উপাদানের যেকোনো একটিতে ঘাটতি থাকলে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ড. বদিউল আলম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা না যায় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হয়, তাহলে জনগণকে বারবার সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামতে হবে। এই ধরনের ধারাবাহিক আন্দোলন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে বরং আরও দুর্বল করে তুলতে পারে। কারণ, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা।
বরিশালে অনুষ্ঠিত এই বিভাগীয় সংলাপে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি অংশ নেন। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজের সদস্য ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
সংলাপে বক্তারা বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য ধাপ হলেও এটিই গণতন্ত্রের একমাত্র শর্ত নয়। একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র।
বক্তারা আরও বলেন, সুশাসন নিশ্চিত না হলে নির্বাচনের ফলাফল যতই গ্রহণযোগ্য হোক না কেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। তারা মনে করেন, ক্ষমতায় যাওয়া নয়, বরং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
সংলাপে আরও উঠে আসে নির্বাচনী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করা এবং নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করা।
ড. বদিউল আলম মজুমদার তার বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল নির্বাচন আয়োজন করলেই চলবে না, বরং নির্বাচনের পরিবেশ, প্রক্রিয়া ও পরবর্তী শাসনব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক দলগুলো এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
এই সংলাপ ও বক্তব্য আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। বরং সময় যত এগোচ্ছে, এই প্রশ্নগুলো ততই জোরালোভাবে সামনে আসছে।