সর্বশেষ :
গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও দূরত্ব ঘোচেনি ড্রোন অনুপ্রবেশে দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার দক্ষিণ কোরিয়ার ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের দাবি ব্রিটিশ এমপিদের বিবাহবার্ষিকীতে ডিভোর্স পেপার, সেলিনার জীবনের কঠিন সত্য উত্তেজনার মধ্যে ইরানের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ হাদীর বিচার চাই: ইনকিলাব মঞ্চ নিয়ে স্ত্রীর প্রশ্ন ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ধস, উন্নয়ন গতি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন রংপুরের ছয় আসনে ভোটের লড়াই, শক্ত অবস্থানে জামায়াত যুব বিশ্বকাপে আজ পর্দা উঠছে, শুরুতেই ভারতের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের

টি২০ বিশ্বকাপ: ভারতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
টি২০ বিশ্বকাপ: ভারতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ১৩  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কা, পাল্টা ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার অবস্থান—সব মিলিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এবং জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোড়ন। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের সূত্রপাত, তা এখন বিসিবি, আইসিসি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ব্যাখ্যায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ দলের জন্য আদৌ কি ভারতে সুনির্দিষ্ট কোনো নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে, নাকি এটি পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা ও অতিরঞ্জনের ফল?

গত সোমবার যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দাবি করেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিরাপত্তা দল বিসিবিকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে, যেখানে তিন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মুস্তাফিজুর রহমান দলে থাকলে, বাংলাদেশের সমর্থকেরা জার্সি পরলে এবং দেশের জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি এও বলেন, চিঠির কপি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই দেশের ক্রীড়া অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা। অনেকেই এটিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে ক্রীড়াব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় সংযোগ ঘটানোর অভিযোগ তোলেন।

তবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পুরো বিষয়টি স্পষ্ট করতে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। বিসিবির ভাষ্য অনুযায়ী, যে চিঠির কথা উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন, সেটি আসলে আইসিসি ও বিসিবির নিরাপত্তা বিভাগের মধ্যে হওয়া একটি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা নয়, বরং টি২০ বিশ্বকাপের আগে নিয়মিত নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়নের অংশ। বিসিবি আরও জানায়, এই যোগাযোগ বাংলাদেশের ম্যাচ ভারত থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার আবেদনের আনুষ্ঠানিক জবাব হিসেবে গণ্য করা যায় না। বিষয়টি নিয়ে তারা আইসিসির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পায় যখন বিখ্যাত ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফো আইসিসির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে। আইসিসি তাদের জানায়, ভারতে টি২০ বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বা সামগ্রিক নিরাপত্তা হুমকি তারা খুঁজে পায়নি। তবে কিছু ভেন্যুতে খুবই স্বল্পমাত্রার ঝুঁকি থাকতে পারে—যা আইসিসির বৈশ্বিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী ম্যাচ স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট নয়। আইসিসি আরও জানায়, বিসিবির সঙ্গে এই আলোচনা ছিল গত সপ্তাহের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের অংশ এবং এতে দলের জন্য বড় কোনো হুমকির কথা বলা হয়নি।

ইএসপিএন ক্রিকইনফোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইসিসির নিরাপত্তা মূল্যায়নে দেখা গেছে, কিছু ভেন্যুতে ঝুঁকি কম থেকে মাঝারি মাত্রার, আবার কোথাও ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। বিশ্বব্যাপী আইসিসি যে মানদণ্ড অনুসরণ করে, সেই হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার নজির নেই। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আসিফ নজরুলের বক্তব্যকে আইসিসি ‘পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা’ হিসেবে দেখছে। নিরাপত্তা মূল্যায়নে কোথাও এমন শর্ত নেই যে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারকে দলে না রাখতে হবে, সমর্থকদের জার্সি পরা নিষিদ্ধ করতে হবে বা একটি দেশের জাতীয় নির্বাচন স্থগিত করার মতো অযৌক্তিক প্রত্যাশা করা হয়েছে।

এই বিতর্কের পেছনের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ম্যাচ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিসিবি গত ৪ জানুয়ারি আইসিসিতে একটি ইমেইল পাঠায়। পরে আইসিসি নিরাপত্তা ঝুঁকির বিস্তারিত ব্যাখ্যা চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিসিবি ৮ জানুয়ারি প্রায় ১০০টির মতো ভিডিও ক্লিপ ও সংবাদ প্রতিবেদনের লিংক সংযুক্ত করে আরেকটি ইমেইল পাঠায়, যেখানে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী জানান, এখনো আইসিসির আনুষ্ঠানিক জবাব আসেনি, তবে দু-এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত চিঠি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই পুরো ঘটনার সূচনায় রয়েছে মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে আইপিএল বিতর্ক। বাংলাদেশের এই তারকা পেসারকে ঘিরে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিবাদের মুখে বিসিসিআই তাঁকে আইপিএল দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পাল্টা জবাবে বিসিবি নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে জানায়, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ দল ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে অনিচ্ছুক। এখান থেকেই আইসিসিতে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড।

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে অনুষ্ঠেয় টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সূচিও ইতিমধ্যে নির্ধারিত। ৭ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনী দিনে কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা টাইগারদের। গ্রুপ পর্বে ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও কলকাতায় ম্যাচ রয়েছে। তবে ভারতীয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকবাজ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, বিসিসিআই প্রতিনিধি ও আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহর বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে—বাংলাদেশকে ভারতেই ম্যাচ খেলতে হবে। প্রয়োজনে কলকাতা থেকে ভেন্যু অন্য রাজ্যে সরানো হতে পারে, কিন্তু শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ নেওয়ার সুযোগ নেই।

এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ভেতরে ক্রিকেট কতটা নিরাপদ ও নিরপেক্ষ থাকতে পারে। একদিকে দেশের ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্য জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে আইসিসি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, বাস্তব চিত্র এতটা ভয়াবহ নয়। ক্রিকেটপ্রেমীদের বড় অংশ মনে করছে, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল যোগাযোগের অভাবই এই বিভ্রান্তির মূল কারণ।

সবশেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বার্থ, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিরপেক্ষতা—এই তিনটির ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আইসিসির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে বিসিবি, ক্রিকেটাররা এবং কোটি কোটি সমর্থক। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, অতিরঞ্জন ও ভুল ব্যাখ্যা যেন মাঠের খেলাকে ছাপিয়ে না যায়—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত