প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি যে ক্রমেই শ্লথ হয়ে পড়ছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে। টানা ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে আটকে থাকা এই প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা নয়, বরং এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে একটি গভীর সংকেত। উচ্চ সুদের হার, অস্বাভাবিক স্প্রেড, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা এখন এক ধরনের দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণে স্থবিরতারই প্রতিফলন। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংকঋণের চাহিদা কমছে, আর এর ফলশ্রুতিতে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা সরাসরি বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভাষায়, দেশে নতুন শিল্প বা সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগ না হলে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ার সুযোগ নেই। বর্তমান চিত্র স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন অথবা সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখছেন।
ব্যাংকারদের বক্তব্যও প্রায় একই সুরে। তাঁদের মতে, উচ্চ সুদহার, দুর্বল ভোক্তা চাহিদা এবং নীতিগত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে বিনিয়োগ স্থবিরতার একটি বড় সূচক হিসেবে দেখছেন। কারণ নতুন শিল্প বা সম্প্রসারণ না হলে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, দেশের বড় শিল্পগ্রুপগুলোর অনেক কারখানা বর্তমানে বন্ধ অথবা আংশিক সক্ষমতায় চলছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় নতুন ঋণের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে আগ্রহ হারাচ্ছে। এই সুযোগে ব্যাংকঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান, অর্থাৎ স্প্রেড, অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ঋণ গ্রহণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠায় ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করলেও ঋণ বিতরণ করেছে গড়ে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ সুদে। ফলে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বাস্তবে কিছু ব্যাংকে এই ব্যবধান ৮ থেকে ১০ শতাংশেরও বেশি। উদ্যোক্তাদের মতে, এমন উচ্চ স্প্রেড ব্যবসার জন্য কার্যত অসহনীয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ দ্রুত কমে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, সুদহার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার সুযোগে কয়েকটি ব্যাংক অস্বাভাবিকভাবে স্প্রেড বাড়িয়েছে। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। ভারতে ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান সাধারণত ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইউরোপের দেশগুলোতে এটি ১ শতাংশের কাছাকাছি, আর যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ২ শতাংশের মধ্যে থাকে। সেখানে বাংলাদেশের উচ্চ স্প্রেড প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। সভায় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্প্রেড বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সম্মিলিত উদ্যোগে তা সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনার আহ্বান জানান। তবে এ বিষয়ে কোনো কঠোর নির্দেশনা না দিয়ে নৈতিক চাপের মাধ্যমেই ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকারদের একটি অংশ বলছে, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানত সরে গিয়ে তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকে জমা হচ্ছে। ফলে এসব ব্যাংক কম সুদ দিয়েও বিপুল আমানত পাচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদ সেই অনুপাতে কমানো হচ্ছে না। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশের বেশি সুদ পাচ্ছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এটি ইতিবাচক নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদসীমা কার্যকর ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতি চালু হয় এবং একই বছরের নভেম্বরে স্প্রেডের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পরিবর্তনের পর থেকেই ঋণের খরচ দ্রুত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থায় যদি শৃঙ্খলা না আসে, তাহলে উচ্চ সুদের চাপ বিনিয়োগ ও উৎপাদনের পথে বড় বাধা হয়ে থাকবে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে গভীর সংকট বিনিয়োগে স্থবিরতা। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ—দুটোই সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের গতি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীর। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সম্প্রতি বলেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়াই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে, বেকারত্ব বাড়ে এবং অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির বড় কারণ সরবরাহজনিত ও কাঠামোগত সমস্যা। এ অবস্থায় শুধু সুদের হার বাড়ানোর নীতি বিনিয়োগকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চ সুদ ও ঋণের অপ্রতুলতার কারণে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারছে না। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে সংকট আরও গভীর হবে।
অর্থনীতিকে সচল রাখতে অগ্রাধিকার খাত—কৃষি, এসএমই, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আবাসন, গার্মেন্টস এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তের ঋণ নিশ্চিত করার দাবি উঠছে। অনেক উদ্যোক্তা অতীতে ৯ শতাংশের কম সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু এখন তাঁদের ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে। নীতি সুদহার এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে উচ্চ সুদের হারে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে গেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি অর্থনীতির গতি হারাচ্ছে। এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগবান্ধব, যুক্তিসংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ সুদহার নির্ধারণ করা। অন্যথায় উচ্চ সুদের চাপে বিনিয়োগের এই স্থবিরতা দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।