মিছিল-অবরোধে নাকাল রাজধানী, বিপর্যস্ত জনজীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৮ বার
মিছিল অবরোধে নাকাল জনজীবন

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজধানী ঢাকায় মিছিল, মিটিং, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ যেন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। ছোট-বড় নানা দাবিকে সামনে রেখে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংগঠনের ব্যানারে রাজপথে নামছেন আন্দোলনকারীরা। কথায় কথায় সড়ক অবরোধ আর কর্মসূচি ঘোষণায় ব্যস্ততম এই মহানগরীতে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট ও অচলাবস্থা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারা, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ক্লাসে বিলম্ব, অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে ভোগান্তি—সব মিলিয়ে জনজীবন হয়ে উঠেছে নাকাল।

দুই কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস এই মহানগরীতে এমনিতেই যানজট একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। তার ওপর প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো সড়ক অবরোধ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কয়েক ঘণ্টার অবরোধ পুরো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে। এক সড়কের জট ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের অন্য সড়কগুলোতেও। ফলে রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছাতে লাগছে স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ সময়।

নগর উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, দাবি আদায়ের একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সংলাপ, স্মারকলিপি, আইনি পথ বা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে দাবি জানানো সম্ভব। কিন্তু সেই পথ উপেক্ষা করে সরাসরি রাজপথ দখল করে আন্দোলন করলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যায়। তারা সতর্ক করে বলেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর এই শহরে যদি প্রতিদিনের বিশৃঙ্খলা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়, তবে চাপা ক্ষোভ একসময় বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

ঢাকা এখন কার্যত আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী, চাকরিপ্রত্যাশী, শ্রমিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ দাবি আদায়ে রাজপথে নামছেন। শাহবাগ মোড় ধীরে ধীরে আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এছাড়া টিএসসি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, কাকরাইল, সচিবালয়ের গেট, প্রেস ক্লাব, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে, মহাখালী রেলগেট ও কাওরানবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যখন-তখন অবরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব জায়গা দিয়ে প্রতিদিন লাখো মানুষ চলাচল করেন। ফলে অবরোধ মানেই হাজারো মানুষের দুর্ভোগ।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পরিস্থিতির মাত্রা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত ১১ ডিসেম্বর রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৬ মাসে দেশে দুই হাজারের বেশি আন্দোলন হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনটি করে আন্দোলন হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের হিসাবে, ৫ আগস্টের পর রাজধানীতে ১৩৯টি সংগঠনের ব্যানারে অন্তত এক হাজার ৭৮৬টি আন্দোলন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শাহবাগ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংলগ্ন এলাকায় হয়েছে এক হাজার ৩৯৮টি আন্দোলন।

এই আন্দোলনগুলোর প্রভাব শুধু যানজটে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষাকেন্দ্রে দেরিতে পৌঁছাচ্ছেন, রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকে পড়ছে অবরোধে। নগরবাসীরা বলছেন, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা মানসিক ও শারীরিকভাবে তাদের ক্লান্ত করে তুলছে।

বিশেষ করে শাহবাগ এলাকায় অবরোধ হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসপাতালসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এই এলাকায় অবস্থিত। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ও স্বজন এখানে যাতায়াত করেন। অবরোধের কারণে অনেক সময় চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মীরাও নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেন না। এতে রোগীদের সেবা ব্যাহত হয়। আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত মাইকের উচ্চশব্দ হাসপাতালের ভেতরে থাকা রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নগরবাসীদের একটি বড় অংশের ধারণা, দীর্ঘদিন যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন না, তারা নতুন সরকার আসার পর নিজেদের স্বার্থ আদায়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে সরকারও কিছু আন্দোলনকারীর দাবি দ্রুত মেনে নেওয়ায় অন্য সংগঠনগুলো উৎসাহিত হচ্ছে। ফলে দাবির স্রোত থামছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও চাপে রয়েছে। রাজধানীতে একের পর এক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। অনেক আন্দোলনকে তারা ‘উদ্দেশ্যমূলক’ বলেও মনে করছে। জনদুর্ভোগ কমাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বারবার অনুরোধ জানালেও বাস্তবে তার সুফল খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

গত ১০ ডিসেম্বর ডিএমপির পক্ষ থেকে জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাস্তা অবরোধ করে যানচলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়। ডিএমপি কমিশনার বেআইনি ও অনুমোদনহীন সমাবেশ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। একই সঙ্গে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সব ধরনের বেআইনি জনসমাবেশ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ডিএমপির মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক অবরোধ করলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, যা কারও কাম্য নয়। তাই নগরবাসীর বৃহত্তর স্বার্থে এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কিছুটা কঠোর হতে হবে। প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দাবি-দাওয়ার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সব দাবি যে যৌক্তিক, বিষয়টি এমন নয়। সরকার যদি সব দাবিতে দ্রুত ছাড় দেয়, তাহলে আন্দোলনের প্রবণতা আরও বাড়বে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সরকার না হলেও অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং এলাকাভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক কমিটির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা, বিকল্প আন্দোলনের সংস্কৃতি এবং দ্রুত সংলাপের পথ খুলে দিতে হবে। নইলে প্রতিদিনের এই অচলাবস্থা ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে পারে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং রাজধানীর রাজপথ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত