প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন গত দশকের মধ্যে সবচেয়ে নীরস অবস্থায় পৌঁছেছে। ধীরগতি ও কার্যকারিতার ঘাটতির কারণে মূল এডিপি থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা হ্রাস করা হয়েছে, যার ফলে মোট বরাদ্দ দুই লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার পরিবর্তে দুই লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা কেটে দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি অর্থায়ন কমে এসেছে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান কমে হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এডিপির কার্যক্রম মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। খাতভিত্তিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স দেখা গেছে স্বাস্থ্য খাতে। মূল এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, যা ধীর বাস্তবায়নের কারণে সংশোধিত এডিপিতে কমিয়ে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা করা হয়েছে। চলতি বছর স্বাস্থ্য খাতে ২৯টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তা ও প্রকল্প পরিচালক সংকটের কারণে কার্যক্রম যথাযথভাবে এগোয়নি।
স্বাস্থ্য খাত ছাড়াও শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৮ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের বরাদ্দও ৩৫ শতাংশ কমানো হয়েছে, আর সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ দুই হাজার ১৮ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে মাত্র ৫৪৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ১৯ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ২১ শতাংশ। কেবল পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সম্পদ খাত ব্যতিক্রম, যেখানে বরাদ্দ ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশোধিত আরএডিপি অনুযায়ী মোট প্রকল্প সংখ্যা এক হাজার ৩৩০টি, যা মূল এডিপির এক হাজার ১৭৩টির তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত প্রকল্প রয়েছে ১৩৮টি, যার মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ১০৮টি, সম্ভাব্যতা যাচাই ৩৫টি, কারিগরি সহায়তায় ১২১টি এবং সংস্থা নিজস্ব অর্থায়নে ৬৬টি। খাতভিত্তিক বরাদ্দে পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ জ্বালানি, গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন অগ্রাধিকার পেয়েছে। এসব খাতে মোট বরাদ্দ এক লাখ ২১ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক কর্মসূচির ৬০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দ ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা পেয়ে মোট আরএডিপির ১৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভাগ নিয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পেয়েছে ১৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ বিভাগ ১৪ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১২ হাজার ২৯ কোটি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ৫৩২ কোটি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ৫৪ কোটি টাকায় বরাদ্দ পেয়েছে।
সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি বিরাজ করছে। অনেক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে পরিচালকশূন্য রয়েছে। নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার সময় স্বচ্ছতার জন্য নতুন শর্তাবলী আরোপ করা হয়েছে। এই শর্তগুলি পূরণের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন ক্ষমতা ও অগ্রগতি বৃদ্ধি করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। সরকারি ও বৈদেশিক বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও শক্তিশালী বাস্তবায়ন কাঠামো প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে তৎপরতা বাড়ানো না হলে দীর্ঘমেয়াদে জনসেবার মান ও দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এডিপির বাস্তবায়ন ও সংশোধন প্রক্রিয়া প্রমাণ করছে, বরাদ্দ ও প্রকল্প সংখ্যা বাড়লেও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দক্ষ প্রশাসনিক মনিটরিং এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্প পরিচালনা।