বছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সে উজ্জ্বল বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
বছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সে উজ্জ্বল বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি বছরের শুরুতেই প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক বার্তা পেল বাংলাদেশ। জানুয়ারি মাসের প্রথম ১১ দিনেই দেশে এসেছে ১৩৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ কোটি ১৫ লাখ ডলারের সমান। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এই প্রবাহকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১১ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর একই সময়ে দেশে এসেছিল মাত্র ৭৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে, যা অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তির খবর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ১১ জানুয়ারি এক দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২০ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার। এক দিনে এত বেশি রেমিট্যান্স আসা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় ঘটনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জানুয়ারি মাস শেষে রেমিট্যান্স নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর প্রবণতাও বেড়েছে। সরকারের প্রণোদনা, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ডিজিটাল উন্নয়ন এবং অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় প্রবাসীরা এখন বেশি আগ্রহী হচ্ছেন বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আরও জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৭৬০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। অর্থবছরের মাঝপথেই এই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করছে, প্রবাসী আয় আবারও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্ত ভিত হিসেবে দাঁড়াচ্ছে।

বিশেষ করে সদ্যসমাপ্ত ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল নজরকাড়া। ওই মাসে দেশে এসেছে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার, যা চলতি অর্থবছরের যেকোনো মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। শুধু তাই নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাসে প্রাপ্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। এর আগে মাত্র একবারই এর চেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরের শেষ প্রান্তে ও নতুন বছরের শুরুতে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য বেশি অর্থ পাঠান, যা ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স বাড়ার অন্যতম কারণ।

দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে চাপের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই রেমিট্যান্স প্রবাহ বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং ডলার সংকট মোকাবিলায় রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বিনিময় হারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবাসী আয় বাড়লে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভই শক্তিশালী হয় না, গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙা হয়। রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ সরাসরি গ্রামাঞ্চলে যায়, যেখানে পরিবারগুলো এই অর্থ ব্যয় করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ছোট ব্যবসায়। ফলে অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসে।

ব্যাংকারদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সুবিধা বেড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল অ্যাপ এবং দ্রুত লেনদেন ব্যবস্থার কারণে প্রবাসীরা সহজেই দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন। পাশাপাশি সরকার ঘোষিত নগদ প্রণোদনাও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। বৈধ পথে পাঠানো অর্থের ওপর প্রণোদনা পাওয়ায় হুন্ডির প্রতি আগ্রহ কমছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে প্রবাসীদের আস্থা ধরে রাখা জরুরি। অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ করা, চার্জ কমানো এবং প্রবাসীদের ব্যাংকিং সেবায় হয়রানি কমানো না গেলে এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানো এবং প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার আরেকটি দিক হলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। নির্মাণ, সেবা ও পরিবহন খাতে কাজের সুযোগ বাড়ায় আয়ও বেড়েছে অনেক প্রবাসীর। সেই আয়ের একটি বড় অংশ দেশে পাঠানো হচ্ছে।

নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন, বছরের শুরুতে যে গতি দেখা যাচ্ছে, তা যদি পুরো বছর ধরে বজায় থাকে, তাহলে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। এতে বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থ জোগান দেওয়া সহজ হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের শুরুতেই প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক চিত্র দেশের অর্থনীতিতে আশার আলো জ্বালিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে রেমিট্যান্স আবারও প্রধান ভরসা হয়ে উঠছে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রবণতা কতটা ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখা যায় এবং তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে কতটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত