প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে জুলাই–আগস্ট ২০২৪ সালের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে। ট্রাইব্যুনালের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৪৫৭ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশ করা হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তদন্তকালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করে। একই রায়ে রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত দণ্ডপ্রাপ্তদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দিয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে অপরাধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রথম অভিযোগ হলো ‘উসকানি ও প্ররোচনা’। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ হিসেবে সম্বোধন করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ফাঁসির নির্দেশ ও প্ররোচনা দিয়েছেন। এই উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত ফল হিসেবে রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আদালত এই অভিযোগের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ও কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেছে।
দ্বিতীয় অভিযোগ হলো ‘সরাসরি হত্যার নির্দেশ’। প্রমাণ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস ও হাসানুল হক ইনুর কথোপকথনে ড্রোনের মাধ্যমে অবস্থান নির্ণয় করে হেলিকপ্টার ও অন্যান্য মারণাস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে ৫ আগস্ট চানখারপুলে ছয়জন এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করা হয় এবং পরে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার নৃশংস ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় শেখ হাসিনা ও কামালকে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
আদালত রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, দণ্ডিতদের দেশে থাকা সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করা হবে। বাজেয়াপ্ত অর্থ ও সম্পদ জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য সরকারের কাছে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ে আরও বলা হয়েছে, দণ্ডিতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে সরকারকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
বিচারিক প্যানেল রায়ে প্রকাশ করেছে যে, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রমাণ সংগ্রহ ও সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। রায়ে দোষীদের বিরুদ্ধে নিখুঁত প্রমাণ ও সাক্ষীর ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনের সীমানার মধ্যে থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এই রায়কে দেশের ইতিহাসে এক বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা মনে করছেন, জুলাই–আগস্ট আন্দোলন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হয়েছে। রায় প্রকাশের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠন প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
রায়ের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের সমালোচনা ও সমর্থন উভয়ই লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রায়ের প্রকাশ বাংলাদেশে আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আদালতের ক্ষমতা এবং জবাবদিহিতার এক উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে থাকবে। এসময় তারা মানবাধিকার ও আইনের শাসন মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বকেও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, রায়ের ফলে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রার সংলাপ ও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেছেন, রায় দেশের জন্য আইনি ও ন্যায়বিচারের একটি নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
সংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত এই পূর্ণাঙ্গ রায় শুধুমাত্র দণ্ডপ্রাপ্তদের জন্য নয়, দেশের জন্যও একটি শিক্ষা। এটি দেশের বিচার ব্যবস্থা, মানুষের বিশ্বাস এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মানকে দৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।