প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে আটক অবস্থায় বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর প্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার এক শোক ও প্রতিবাদমূলক বিবৃতিতে তিনি এই দাবি জানান।
বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, প্রচলিত আইন ও সংবিধানের বাইরে গিয়ে কাউকে আটক করে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা রাষ্ট্রীয় আইনের চরম অবমাননার শামিল। তার ভাষায়, “শামসুজ্জামান ডাবলুকে অস্ত্র উদ্ধারের নামে ধরে নিয়ে গিয়ে যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং যার পরিণতিতে তার মৃত্যু হয়েছে—তা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলু স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ছিলেন। দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি অনুযায়ী, সোমবার রাতে তাকে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে তার মরদেহ জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, যা এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
মির্জা ফখরুল তার বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জনগণের প্রত্যাশা ছিল—যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত হবে। কিন্তু বাস্তবে যদি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোনো বাহিনী কাউকে নির্যাতন করে হত্যা করে, তাহলে তা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি, এই লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে সেনাপ্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
বিএনপি মহাসচিব এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ডাবলুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
এই ঘটনার পর জীবননগর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির নেতাকর্মীরা হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করা হয়। দলটির স্থানীয় নেতারা দাবি করেন, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে নির্যাতনের ফলেই ডাবলুর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিভিন্ন স্থানে হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনা বাড়ছে। তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে শাস্তি দেওয়া নয়।
এ ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, আটক অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ চাওয়ার মাধ্যমে বিএনপি কেবল রাজনৈতিক অবস্থানই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকেই ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছে। এটি পরিস্থিতির গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতাকেই নির্দেশ করে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য এখনো দেওয়া হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত করা হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। কারণ, আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান জনগণের কাছে আরও স্পষ্ট হবে এই তদন্তের মাধ্যমে।
ডাবলুর মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে—তিনি কীভাবে আটক হলেন, কী অবস্থায় ছিলেন, কীভাবে তার মৃত্যু হলো—এসবের উত্তর না মিললে জনমনে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়, বরং গোটা রাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর আলো ফেলেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ চাওয়ার আহ্বান সেই উদ্বেগ ও প্রত্যাশারই প্রতিফলন—যাতে কোনো নাগরিক আর বিচারবহির্ভূত সহিংসতার শিকার না হন এবং আইনের শাসন সত্যিকার অর্থেই প্রতিষ্ঠিত হয়।