প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংবিরোধী অভিযানে আরেকটি আলোচিত অধ্যায় যুক্ত হলো সাবেক সংসদ সদস্য ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তি জব্দের মাধ্যমে। তার মালিকানাধীন চারটি বাড়ি এবং পূর্বাচলে থাকা একটি প্লটসহ একাধিক সম্পত্তি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ দুদকের আবেদনের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়, অনুসন্ধানাধীন মানিলন্ডারিং মামলার স্বার্থে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট স্থাবর সম্পদগুলো জব্দ রাখা হবে, যাতে তদন্ত চলাকালে সম্পত্তি হস্তান্তর বা বেহাত হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, জব্দকৃত সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে রাজধানীর অভিজাত এলাকা মহাখালী ডিওএইচএসে অবস্থিত একটি পাঁচতলা বাড়ি। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় দুটি দুইতলা বাড়ি, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় একটি চারতলা বাড়ি জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি পূর্বাচলে অবস্থিত নয় কাঠার একটি প্লট, মানিকগঞ্জে পাঁচ শতাংশ জমি, সিংগাইরে সাত শতাংশ জমি এবং আরও ৪১২ দশমিক ৫১ শতাংশ জমিও জব্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দুদকের পক্ষ থেকে এই আবেদন করেন সংস্থাটির উপপরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম এবং তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে একটি অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান চলাকালীন সময়ে এসব স্থাবর সম্পত্তি জব্দ না করা হলে সেগুলো হস্তান্তর বা বিক্রির মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হতে পারে। তাই রাষ্ট্রের স্বার্থে এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আদালতের মাধ্যমে জব্দের আদেশ প্রয়োজন ছিল।
আদালত দুদকের যুক্তি ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তিগুলো জব্দ রাখার নির্দেশ দেন। এ আদেশের ফলে মমতাজ বেগমের নামে থাকা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পদ এখন রাষ্ট্রীয় নজরদারির আওতায় চলে এলো।
উল্লেখ্য, মমতাজ বেগম এক সময় লোকসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে এই মামলাটি শুরু থেকেই জনমনে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৩ মে রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারের পর তাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং একাধিক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।
দুদক ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অনুসন্ধানে তার আয়-ব্যয়ের মধ্যে অসঙ্গতির পাশাপাশি সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বৈধ করার অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে বলে জানা গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধান চলাকালে সম্পত্তি জব্দ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্টরা তদন্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ পান না। বিশেষ করে মানিলন্ডারিংয়ের মতো অপরাধে অর্থ ও সম্পত্তি দ্রুত হাতবদল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সে কারণে আদালতের এই আদেশ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, মমতাজ বেগমের আইনজীবীরা আগেও দাবি করেছেন যে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। তবে জব্দাদেশের পর এ বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুসন্ধানটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে এবং এতে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। আইনের আওতায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ জনপ্রিয় শিল্পী বা প্রভাবশালী রাজনীতিক হলেও আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির প্রতিফলন হিসেবেই তারা বিষয়টি দেখছেন।
সব মিলিয়ে, সাবেক সংসদ সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের চারটি বাড়ি ও পূর্বাচলের প্লট জব্দের আদালতের আদেশ দেশের দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংবিরোধী অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।