প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর ও গতিশীল করার প্রত্যাশা নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে এই সাক্ষাৎকে কূটনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার নিয়ে এই সাক্ষাতে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই সৌজন্য সাক্ষাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। মূলত নিজের পরিচয়পত্র পেশের আগে প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির অংশ হিসেবেই এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করবেন। তার আগে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ধরনের সাক্ষাৎ নতুন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এর আগে সোমবার (১২ জানুয়ারি) কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় পৌঁছানোর পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নবনিযুক্ত এই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানান ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে তার ঢাকা মিশনের সূচনা হয়।
কূটনৈতিক মহলের মতে, চলতি সপ্তাহেই পরিচয়পত্র পেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় নিজের মিশন শুরু করবেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। এরই মধ্যে তিনি পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং রাষ্ট্রাচার অনুবিভাগের প্রধান নুরুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করে পরিচয়পত্র পেশের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) তিনি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করবেন।
নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন গত ৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশটির ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল জে রিগাস তাকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের পরপরই ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস তাকে স্বাগত জানায় এবং তার দায়িত্ব পালনে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়।
বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত এবং আবারও এই দেশে ফিরে আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে কর্মরত আমেরিকান ও স্থানীয় কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী দলের নেতৃত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে তিনি কাজ করতে চান।
তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য ও পররাষ্ট্রনীতিকে এগিয়ে নিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করার জন্য প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করতে তিনি উচ্ছ্বসিত। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মনোনীত এই কূটনীতিক ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিটার হাস। তিনি ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে দায়িত্বে ছিলেন। তার বিদায়ের পর কিছু সময় রাষ্ট্রদূত পদটি শূন্য ছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। কূটনীতিক হিসেবে তার রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের সঙ্গেও তার পরিচয় নতুন নয়। অতীতেও তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে তিনি সরাসরি কাজ করেছেন। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও কূটনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে তার রয়েছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই পূর্ব অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও জোরদার হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সৌজন্য সাক্ষাতে দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা হয়। যদিও বৈঠকটি মূলত আনুষ্ঠানিক ছিল, তবুও এতে উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের এই সৌজন্য সাক্ষাৎ বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই দেশের সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রা পায়, সে দিকেই এখন নজর কূটনৈতিক অঙ্গনের।