প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেছেন, ইরানের নেতৃত্ব তার ‘শেষ দিন এবং সপ্তাহগুলোতে’ পৌঁছেছে, কারণ দেশটি তীব্র বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ভারত সফরের সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। চ্যান্সেলরের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থা শুধুমাত্র সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যা কার্যত তাদের সময়ের শেষ ইঙ্গিত বহন করছে।
মের্জ বলেন, “আমি মনে করি আমরা এখন সেই সময় দেখছি, যখন জনগণ আর এই শাসনব্যবস্থার নীতির অধীনে থাকতে চাচ্ছে না। জনগণ এখন শক্তভাবে প্রতিবাদ করছে এবং স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত শাসনের দাবি জানাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জার্মানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ইউরোপীয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। তেহরানের কাছে মের্জ জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের উপর দমন-পীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে হবে।
ইরানের রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন নয়, তবে গত বছরের শেষ দিকে মুদ্রার পতন, অর্থনৈতিক সংকট এবং বেকারত্বের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদের পথে নামতে বাধ্য হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘাত দেশজুড়ে সহিংসতায় পরিণত হয়েছে। এসব সংঘাতের ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বৈধতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলরের মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে সচেতন অবস্থানে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে জার্মানি সীমিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে তেহরানের অন্যতম প্রধান ইউরোপীয় অংশীদার হিসেবে অবস্থান করছে।
ফেডারেল পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে জার্মানি থেকে ইরানে রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমে ৮৭১ মিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে, যা মোট জার্মান রপ্তানির মাত্র ০.১ শতাংশের কম। এই তথ্যই প্রমাণ করে যে, অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ সত্ত্বেও জার্মানি এখনও সীমিতভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বজায় রাখছে।
চ্যান্সেলর মের্জ ভারতের সফরে ইরানি নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “যখন কোনো শাসনব্যবস্থা শুধুমাত্র সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখে, তখন তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জনগণ এখন তাদের ওপর আর ত্যাগ স্বীকার করবে না। এটি সময়ের সঙ্গে সরকারের সমাপ্তি নির্দেশ করে।”
ইরানের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ মূলত ছাত্র ও নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সমস্যা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চমূল্য এবং বেকারত্ব ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। ফলে জনগণকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করা হয়েছে। চ্যান্সেলর মের্জের মতে, এই বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপ ইরান সরকারকে পরিবর্তনের পথে ঠেলে দিচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
যদিও চ্যান্সেলর মের্জ ইরানের সঙ্গে জার্মানির বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি, তবে তিনি জার্মানির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তেহরানকে বিক্ষোভ দমন থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ এই মুহূর্তে ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে এবং তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট ও বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করছে। চ্যান্সেলরের মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের নেতৃত্বের বৈধতা ও ক্ষমতা ভবিষ্যতে টেকসই নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং জনগণের তীব্র অসন্তোষ মিলিত হয়ে দেশটিকে গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।
মের্জের বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট সংকেত যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা জনগণের প্রগাঢ় প্রতিবাদ ও চাপের মুখোমুখি। জার্মানি এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা মনে করছেন, ইরানের রাজনৈতিক সংকট শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়া, ইরানের বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ও দামও প্রভাবিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের আরও সতর্ক করে তুলেছে। চ্যান্সেলর মের্জ বলছেন, “আমরা এই শাসনব্যবস্থার শেষ দিন ও সপ্তাহগুলো দেখছি। সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় পদক্ষেপের।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রস্তাব এবং জার্মানির সীমিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চাপ বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, রাজনৈতিক বৈধতার সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপে দেশটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনোযোগ দিয়ে দেখছে, জনগণ কীভাবে এই পরিস্থিতিতে তাদের দাবী বাস্তবায়ন করবে। চ্যান্সেলর মের্জের মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, বর্তমান সরকারকে পরিবর্তনের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ইরান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দিকেও এগোতে বাধ্য হবে।