চট্টগ্রামে জামায়াত কর্মী হত্যা মামলায় পলাতক আসামি গ্রেপ্তার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
চট্টগ্রামে জামায়াত কর্মী হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে জামায়াত কর্মী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন হত্যা মামলায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা পলাতক আসামি নাজিম উদ্দিন (৫২)–কে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৭। নগরের ব্যস্ততম এলাকা কোতোয়ালি থানার এনায়েতবাজার মহিলা কলেজের সামনে সোমবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে পরিচালিত এক অভিযানে তাকে আটক করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার র‍্যাব বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসবে বলে আশা করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

র‍্যাবের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকেই নাজিম উদ্দিন শহরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়িয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আড়াল করাই ছিল তার কৌশল। কখনো আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, কখনো জনবহুল এলাকায় অস্থায়ীভাবে অবস্থান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। তবে গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তির সহায়তায় শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় র‍্যাব-৭। অভিযানটি ছিল নিখুঁত পরিকল্পনার ফল, যেখানে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

ফটিকছড়ি উপজেলার লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর দিঘীরপাড় এলাকায় গত শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে করে আসা তিনজন সশস্ত্র ব্যক্তি হঠাৎ করে জামাল উদ্দিনকে লক্ষ্য করে কাছ থেকে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ও চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা যায়, তার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত মোট ১৩টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা হামলার ভয়াবহতা ও পরিকল্পিত চরিত্রকে স্পষ্ট করে।

এই হামলায় জামাল উদ্দিনের সঙ্গে থাকা নাসির উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নাসির উদ্দিনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক, তবে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার জবানবন্দি ও শারীরিক অবস্থার উন্নতির ওপর নির্ভর করে মামলার তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

র‍্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের পর নাজিম উদ্দিনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এতে হত্যাকাণ্ডের পেছনের সম্ভাব্য মোটিভ, পরিকল্পনা এবং অন্যান্য জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ফটিকছড়ি থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন থেকে মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া ও গভীর তদন্ত পুলিশ পরিচালনা করবে।

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তকারীরা একাধিক দিক বিবেচনায় নিচ্ছেন। নিহত জামাল উদ্দিন জামায়াতের কর্মী হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি একই সঙ্গে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতা—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তার অতীত ইতিহাস তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। জানা গেছে, ২০০১ সালে সংঘটিত তিনটি হত্যা মামলায় তার নাম আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময়কার কোনো বিরোধ বা শত্রুতা দীর্ঘদিন পর প্রতিশোধে রূপ নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ফটিকছড়ির মতো এলাকায় প্রকাশ্যে এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। অনেকে মনে করছেন, দ্রুত দোষীদের শনাক্ত ও শাস্তির আওতায় আনা না গেলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। এ কারণে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন মহল থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকলে তা বৃহত্তর পরিসরে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

র‍্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার অন্যান্য পলাতক আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আহত নাসির উদ্দিনের সুস্থ হয়ে ওঠার পর তার বিস্তারিত জবানবন্দিও মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই গ্রেপ্তার প্রমাণ করে যে, অপরাধ করে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়। চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যে জোরদার হয়েছে, নাজিম উদ্দিনের গ্রেপ্তার তারই একটি উদাহরণ। এখন দেখার বিষয়, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের পূর্ণ চিত্র কত দ্রুত উদ্ঘাটিত হয় এবং ন্যায়বিচার কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত