প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন ও নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারিত সব ধরনের বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন। ট্রাম্পের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মঙ্গলবার ১৩ জানুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালসহ অন্যান্য মাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘নির্মম হত্যাকাণ্ড’ ও দমন-পীড়ন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা বৈঠকে বসবেন না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার প্রশ্নই ওঠে না।
ট্রাম্প তার পোস্টে ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, “ইরানি দেশপ্রেমিকরা, প্রতিবাদ চালিয়ে যাও—তোমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করো। খুনি ও নির্যাতনকারীদের মনে রাখো। তাদের বড় মূল্য দিতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের জন্য ‘সাহায্য আসছে’। তবে কী ধরনের সহায়তার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
এই বক্তব্যের পর সাংবাদিকরা ট্রাম্পের কাছে ‘সাহায্য আসছে’ মন্তব্যের অর্থ জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান। জবাবে তিনি বলেন, “আপনাকেই সেটা খুঁজে বের করতে হবে।” তার এই রহস্যময় উত্তর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা গোপন কোনো রাজনৈতিক সহায়তার ইঙ্গিত হতে পারে, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতির কথাও এতে নিহিত থাকতে পারে।
গত কয়েকদিন ধরেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলে আসছেন। তিনি আগেও দাবি করেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে। এমন হুঁশিয়ারির পর তেহরান আলোচনার আগ্রহ দেখালেও ট্রাম্প তখনও বলেছিলেন, আলোচনা শুরু হলেও তার আগে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তার এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তুলেছে।
ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে। সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশকে যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এই ঘোষণাকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এর ঠিক পরদিন মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক সতর্কবার্তায় জানায়, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে মার্কিন নাগরিকদের ‘অবিলম্বে ইরান ত্যাগ করা উচিত’। একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়, সংকটের সময়ে ইরানে কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বৈঠক বাতিলের ঘোষণা কেবল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানাতে চাচ্ছে যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই, যতক্ষণ না পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে।
অন্যদিকে ইরান বরাবরের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের এসব বক্তব্য ও পদক্ষেপকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, দেশটির চলমান অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, শুরুতে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে বিদেশি মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এতে সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতেই এসব ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবশ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের তথ্যমতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে। গ্রেপ্তার, আটক, গুলি ও সহিংসতায় সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও বেসরকারি সূত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইরানে গত ডিসেম্বর থেকে মুদ্রার দরপতন, চরম মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন সরকারবিরোধী রূপ নেয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই অস্থিরতা দেশটির অর্থনীতি, প্রশাসন ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত ইরান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একদিকে তিনি বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন, অন্যদিকে সামরিক হামলার হুমকি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার করছেন। এতে ইরান সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে, যা সহিংসতা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে।
একই সঙ্গে এই সংকটের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে এর প্রতিফলন ঘটার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
সব মিলিয়ে, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দিয়ে এবং বিক্ষোভকারীদের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও কঠোর পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। এই অবস্থান শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলবে নাকি পরিস্থিতিকে আরও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেবে—তা সময়ই বলে দেবে।