৫৪ বছরে রেকর্ড: ৩ হাজার নবীন বিজিবি সদস্যের শপথ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৯ বার
৩ হাজার নবীন বিজিবি সদস্য শপথ

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—সংক্ষেপে বিজিবি—আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক নবীন সদস্যের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হলো। ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে একসঙ্গে ৩ হাজার ২৩ জন নবীন বিজিবি সদস্য দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার শপথ নিচ্ছেন। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বিজিবির ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি এক অনন্য রেকর্ড।

আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাইতুল ইজ্জতে অবস্থিত বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজের বিজিটিসিএন্ডসি’র ঐতিহ্যবাহী ‘বীর উত্তম মজিবুর রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে’ এই প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। সারিবদ্ধ কদমে নবীন সৈনিকদের দৃপ্ত পদচারণা, শৃঙ্খলাবদ্ধ কুচকাওয়াজ এবং সমবেত শপথ উচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্যারেড গ্রাউন্ড। উপস্থিত দর্শক, অভিভাবক ও অতিথিদের চোখেমুখে ছিল গর্ব ও আবেগের ছাপ।

এই ব্যাচে শপথ নেওয়া ৩ হাজার ২৩ জন নবীন সদস্যের মধ্যে পুরুষ রয়েছেন ২ হাজার ৯৫০ জন এবং নারী রয়েছেন ৭৩ জন। সংখ্যার দিক থেকে যেমন এটি একটি রেকর্ড, তেমনি নারী সদস্যদের অংশগ্রহণও বিজিবির আধুনিকায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সীমান্ত নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জিং দায়িত্বে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ বাহিনীর সক্ষমতা ও সামাজিক অগ্রগতির দিকটিও তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি নবীন সৈনিকদের শপথ গ্রহণ করান, কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বিজিটিসিএন্ডসি’র কমান্ড্যান্টসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা।

শপথ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ, চোরাচালান দমন এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবির ভূমিকার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। নবীন সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শৃঙ্খলা, সততা ও দেশপ্রেম—এই তিনটি মূল্যবোধ ধারণ করেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। সীমান্তে দায়িত্ব পালনের সময় যেকোনো ধরনের চাপ ও প্রলোভনের মুখেও নৈতিক অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বিজিবি সূত্র জানায়, ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচে সব বিষয়ে সেরা নবীন সৈনিক হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন আল ইমরান, যার বক্ষ নম্বর ১৫৫। তার সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং কঠোর প্রশিক্ষণ, অধ্যবসায় ও মানসিক দৃঢ়তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। শারীরিক উৎকর্ষতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন শপিকুল ইসলাম (পুরুষ) ও লুবনা খাতুন (মহিলা)। শ্রেষ্ঠ ফায়ারার হিসেবে নির্বাচিত হন শফিকুর রহমান তামিম (পুরুষ) ও নাহিদা আক্তার (মহিলা)। এই অর্জনগুলো নবীন সদস্যদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও পেশাগত উৎকর্ষের মানসিকতা গড়ে তোলার প্রতিফলন।

বিজিটিসিএন্ডসি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিষ্ঠানটি গত ৪৪ বছর ধরে বিজিবির রিক্রুটদের মৌলিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭২টি ব্যাচকে সফলভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে এই প্রতিষ্ঠান। সাধারণত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির সক্ষমতা ৭০০ থেকে ১ হাজার জন রিক্রুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে বর্তমান বাস্তবতা, সীমান্ত নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এবং জনবল বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনা ও বিজিবি সদর দপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আবাসন, প্রশিক্ষণ উপকরণ ও ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ করা হয়। এর ফলেই একসঙ্গে ৩ হাজার ২৩ জন রিক্রুটকে মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

প্রশিক্ষণকালীন সময়ে নবীন রিক্রুটদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অস্ত্রচালনা, কুচকাওয়াজ, সীমান্ত আইন, মানবাধিকার, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের মানসিক দৃঢ়তা ও দলগত কাজের সক্ষমতা বাড়াতে বাস্তবসম্মত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত বড় ব্যাচ পরিচালনা করা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা সফলভাবে সম্পন্ন করা গেছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত নবীন সদস্যদের পরিবার ও স্বজনদের আবেগ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু, আবার অনেকের মুখে ছিল সন্তানের প্রতি গর্বের হাসি। গ্রাম থেকে শহর—দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা এই তরুণ-তরুণীরা আজ এক অভিন্ন পরিচয়ে দেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন থেকেই তারা বিজিবিতে যোগ দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজিবির জনবল বৃদ্ধি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত অপরাধ দমনে প্রশিক্ষিত ও সংখ্যায় শক্তিশালী বাহিনী অপরিহার্য। এই রেকর্ডসংখ্যক নবীন সদস্যের সংযোজন বিজিবির সক্ষমতা আরও জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বিজিবির ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ৫৪ বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যক নবীন সদস্যের শপথ গ্রহণ দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন শক্তি ও প্রত্যয় দেবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত