রিয়ালের নতুন কোচ আরবেলোয়া: নতুন মরিনিও নাকি নতুন জিদান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
রিয়ালের নতুন কোচ আরবেলোয়া: নতুন মরিনিও নাকি নতুন জিদান

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে পরিবর্তন মানেই শুধু একজন কোচের বিদায় নয়, বরং একটি যুগের সমাপ্তি এবং আরেকটি সম্ভাবনার সূচনা। সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায় শুরু হলো আলভারো আরবেলোয়ার হাত ধরে। স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার কাছে ৩–২ গোলে হারের পর জাবি আলোনসোর বিদায়ের যে আভাস মিলেছিল, সেটিই দ্রুত বাস্তব রূপ নেয়। মাত্র ৭ মাস ১৭ দিনের মাথায় জাবিকে বরখাস্ত করে রিয়াল মাদ্রিদ মূল দলের দায়িত্ব তুলে দেয় ক্লাবেরই সাবেক ফুটবলার ও ‘বি’ দলের কোচ আলভারো আরবেলোয়ার হাতে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে নাটকীয়তা যেমন আছে, তেমনি আছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। গত বছরের সেপ্টেম্বরেই যেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন জাবি আলোনসো নিজেই। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, আরবেলোয়া একদিন রিয়াল মাদ্রিদের মূল দলের কোচ হতে পারেন। তখন জাবি ছিলেন মূল দলের কোচ, আরবেলোয়া কাস্তিয়া বা ‘বি’ দলের দায়িত্বে। দুজনের সম্পর্ক ছিল গভীর বন্ধুত্বের, খেলোয়াড়ি জীবনে সাত বছর একসঙ্গে কাটানো সতীর্থের সম্পর্ক। আরবেলোয়ার ভাষায়, ‘জাবি আমার কাছে ভাইয়ের মতো।’ সেই ভাইয়ের জায়গায় শেষ পর্যন্ত বসতে হলো তাকেই।

জাবি আলোনসোর সঙ্গে রিয়ালের সম্পর্ক যে ভেঙে পড়ছে, তার আভাস পাওয়া গিয়েছিল আরও আগে। গত বছরের বড়দিনে ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের ভাষণে জাবির নাম একবারও উচ্চারিত হয়নি। তখনই অনেকের মনে সন্দেহ জেগেছিল, ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ঠিক নেই। মাঠের পারফরম্যান্সেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। জাবির অধীনে রিয়ালের খেলায় ঐতিহ্যবাহী আগ্রাসন ও নিয়ন্ত্রণের ছাপ ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যায়। ড্রেসিংরুমে নিয়ন্ত্রণ হারানোর গুঞ্জন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে দূরত্ব—সব মিলিয়ে চাপ বাড়তে থাকে। সুপার কাপ ফাইনালের পর সেই চাপই বিস্ফোরিত হয়।

ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের পাথরের মতো মুখ অনেক কিছু বলে দিয়েছিল। জাবি আলোনসো বাঁ হাত দিয়ে হালকা আলিঙ্গনের চেষ্টা করলেও রিয়াল সভাপতির চোখে-মুখে ছিল শীতলতা। অনেকেই তখনই ধরে নিয়েছিলেন, নতুন কোচের নাম হয়তো খুব দূরে নয়। আর সেই নামটাই হয়ে উঠলেন আলভারো আরবেলোয়া।

রিয়াল মাদ্রিদ আনুষ্ঠানিকভাবে কত দিনের জন্য তাঁর সঙ্গে চুক্তি করেছে, তা এখনো প্রকাশ করেনি। তবে ‘বি’ দল থেকে সরাসরি মূল দলে পদোন্নতি পাওয়ায় স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আরবেলোয়ার ওপর আস্থা রেখেছে ক্লাব।

আলভারো আরবেলোয়া স্পেনের সালামানকায় জন্ম নেওয়া এক ফুটবল সৈনিক। ২০০১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেন। সেখান থেকে কাস্তিয়া হয়ে মূল দলে ওঠা, এরপর ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে খেলা এবং আবার রিয়ালে ফেরা—এই যাত্রা তাঁকে তৈরি করেছে ‘রিয়াল ডিএনএ’-র এক পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হিসেবে। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি কখনোই সবচেয়ে ঝলমলে তারকা ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন নির্ভরতার নাম। ফুলব্যাক পজিশনে তাঁর আগ্রাসী মানসিকতা, লড়াকু স্বভাব এবং কৌশলগত শৃঙ্খলা তাঁকে কোচিংয়ের পথে এগিয়ে নেওয়ার ভিত গড়ে দেয়।

রিয়ালের সঙ্গে আরবেলোয়ার সম্পর্ক শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অবসর নেওয়ার তিন বছর পর, ২০২০ সালে তিনি রিয়ালের অনূর্ধ্ব–১৪ দলের কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই ধাপে ধাপে ‘লা ফাব্রিকা’য় নিজের দক্ষতার ছাপ রাখতে থাকেন। বয়সভিত্তিক দলগুলোতে তাঁর সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। অনূর্ধ্ব–১৯ দলের হয়ে ট্রেবল জেতা, রেকর্ড সময়ে ১০০ জয়, ধারাবাহিক লিগ শিরোপা—সব মিলিয়ে তিনি প্রমাণ করেন, তিনি শুধু সাবেক ফুটবলার নন, একজন পরিকল্পিত কোচও।

এই জায়গাতেই রিয়াল মাদ্রিদ খুঁজে পায় ‘নতুন জিদান’-এর ছায়া। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার মতে, যেমন করে একসময় জিনেদিন জিদানের ওপর নিঃশর্ত আস্থা রেখেছিল রিয়াল, ঠিক তেমনই আস্থা এখন আরবেলোয়ার ওপর। জিদানও কাস্তিয়া থেকে মূল দলের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, আর বাকিটা ইতিহাস। রাউল গঞ্জালেস দীর্ঘদিন ‘বি’ দলের কোচ হয়েও মূল দলে সুযোগ না পেলেও, আরবেলোয়া মাত্র কয়েক মাসেই সেই লাফটা দিয়ে ফেললেন। কারণ, ক্লাবের চোখে তিনি শুধু ‘ঘরের ছেলে’ নন, বরং আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে মানানসই এক নেতৃত্ব।

কোচ হিসেবে আরবেলোয়ার দর্শন আক্রমণাত্মক এবং সরাসরি। খেলোয়াড়ি জীবনে যেমন বল পায়ে রেখে সময় নষ্ট করতেন না, কোচ হিসেবেও তেমনই দ্রুত সিদ্ধান্ত, দ্রুত আক্রমণ তাঁর পছন্দ। লিভারপুলে ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর কোচিং দর্শনে গভীর ছাপ ফেলেছে। উচ্চ প্রেসিং, প্রতিপক্ষের বক্সের কাছাকাছি বল ছিনিয়ে নেওয়া, বল হারালেই দলগতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া—এসবই তাঁর ফুটবলের মূল ভিত্তি।

একই সঙ্গে আরবেলোয়া আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বাসী। অনুশীলনে ড্রোন ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের অবস্থান ও গতি বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এসবই তাঁর কাজের অংশ। ক্লাব–সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, ‘আরবেলোয়া এই ক্লাবের সবকিছু জানেন, তাঁর কাছে কিছুই অজানা নয়।’ জাবি আলোনসোর সময়কার কৌশল, খেলোয়াড়দের বর্তমান মানসিকতা ও ফিটনেস—সব তথ্যই নাকি তাঁর নখদর্পণে।

তবে আরবেলোয়ার আরেকটি পরিচয় আছে, যেটা তাঁকে আলাদা করে তোলে। তিনি বাকপটু, আপসহীন এবং বিতর্ক এড়াতে পছন্দ করেন না। দল খারাপ খেললে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো, রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুখ খোলা—এসব তাঁর স্বভাবের অংশ। এই দিক থেকে অনেকেই তাঁকে ‘নতুন মরিনিও’ বলতে শুরু করেছেন। নিজেও একসময় স্বীকার করেছিলেন, তিনি একজন ‘মরিনিওস্তা’। তবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি মরিনিও হওয়ার চেষ্টা করবেন না, বরং আলভারো আরবেলোয়াই থাকবেন।

রিয়ালের সাবেক খেলোয়াড় ও বিশ্লেষকদের কথায়ও উঠে আসছে আশাবাদ। হোর্হে ভালদানো মনে করেন, ক্লাবের ভেতরের কাঠামো বোঝার দিক থেকে আরবেলোয়া এগিয়ে থাকবেন। গুতি স্মরণ করিয়ে দেন, জিদানের প্রথম দিনগুলোও সহজ ছিল না, কিন্তু ক্লাব জানত সে কী করতে পারে। একই বিশ্বাস এখন আরবেলোয়ার ক্ষেত্রেও।

আগামী বুধবার কোপা দেল রের শেষ ষোলোয় আরবাখেটের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের মূল দলের কোচ হিসেবে ডাগআউটে অভিষেক হবে আলভারো আরবেলোয়ার। প্রশ্ন একটাই—তিনি কি হবেন নতুন মরিনিওর মতো আগ্রাসী ও বিতর্কপ্রবণ, নাকি নতুন জিদানের মতো শান্ত, নিয়ন্ত্রিত ও সফল? উত্তর দেবে সময়, আর বার্নাব্যুর আলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত